২০২৫ সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার: মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক রহস্য উন্মোচন
- ০১:১৬
- জার্ণাল.কসমিক কালচার
- ৯৭
আমাদের শরীরের শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রতিদিন হাজারো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর আক্রমণ থেকে আমাদের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা যদি নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে সেটিই আমাদের নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে পারে। এই জটিল ভারসাম্যের রহস্য উন্মোচনের জন্য ২০২৫ সালের চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী - মেরি ই. ব্রানকো, ফ্রেড র্যামসডেল এবং শিমন সাকাগুচি।
তাঁরা শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার এক মৌলিক দিক - প্রান্তিক রোগপ্রতিরোধ সহনশীলতা নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই নিজের ওপর হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে। এই আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, বিশেষ করে ক্যান্সার ও অটোইমিউন রোগের (যেমন টাইপ-১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস ইত্যাদি) চিকিৎসায়।
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা - বিবর্তনের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি
মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বিবর্তনের এক অনন্য সৃষ্টি, যা প্রতিদিন আমাদের শরীরে আক্রমণ করার চেষ্টারত অসংখ্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকেজো হয়ে গেলে আমাদের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
দেহের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে আশ্চর্য দিক হলো, এটি সূক্ষ্মভাবে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও শরীরের নিজস্ব কোষ শনাক্ত করতে পারে। আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ জীবাণুগুলো নির্দিষ্ট কোনো বেশে আসে না-তাদের চেহারা একে অপরের থেকে ভিন্ন। এমনকি কিছু জীবাণু মানব কোষের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ছদ্মবেশ ধারণ করে। তাহলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে বুঝতে পারে, কোন কোষটিকে আক্রমণ করতে হবে এবং কোনটিকে রক্ষা করতে হবে? কেনই বা এটি প্রায়শই আমাদের শরীরকে আক্রমণ করে না?
দীর্ঘদিন গবেষকদের ধারণা ছিল যে, তাঁরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানেন - অর্থাৎ, রোগপ্রতিরোধী কোষগুলো কেন্দ্রীয় রোগপ্রতিরোধ সহনশীলতা নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু বাস্তবে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাঁদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এই কারণেই এবারের নোবেল পুরস্কার প্রান্তিক রোগপ্রতিরোধ সহনশীলতা সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য প্রদান করা হয়েছে।
এই তিন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নিরাপত্তা রক্ষী - নিয়ন্ত্রক টি কোষ শনাক্ত করেছেন, যা একটি নতুন গবেষণামূলক ক্ষেত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁদের গবেষণা এমন সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নয়নের পথ দেখিয়েছে, যা বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে অটোইমিউন রোগগুলির চিকিৎসা বা নিরাময় করা সম্ভব হবে, আরও কার্যকর ক্যান্সার চিকিৎসা প্রদান করা যাবে এবং স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পরে গুরুতর জটিলতা রোধ করা যাবে।
টি কোষ - শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য খেলোয়াড়
ক. সহায়ক টি কোষ অবিরাম শরীর টহল দেয়। যদি তারা কোনো আক্রমণকারী জীবাণু আবিষ্কার করে, তবে তারা অন্যান্য ইমিউন কোষকে সতর্ক করে, যা তখন আক্রমণ শুরু করে।
খ. ঘাতক টি কোষ ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত কোষগুলিকে নির্মূল করে; তারা টিউমার কোষগুলিকেও আক্রমণ করতে পারে।
সকল টি কোষের পৃষ্ঠে “টি-কোষ রিসেপ্টর” নামক বিশেষ প্রোটিন থাকে, যা একধরনের সেন্সরের মতো কাজ করে। এগুলি ব্যবহার করে টি কোষ শরীরের অন্যান্য কোষ স্ক্যান করে দেখে, কোনো আক্রমণ হয়েছে কিনা। প্রতিটি রিসেপ্টরের গঠন আলাদা - অনেকটা জিগস পাজলের টুকরোর মতো। এগুলি বহু জিনের সমন্বয়ে গঠিত যা এলোমেলোভাবে একত্রিত হয়। তাত্ত্বিকভাবে, মানবদেহ ১০¹5-এরও বেশি ধরনের টি কোষ রিসেপ্টর তৈরি করতে পারে।
বিভিন্ন রিসেপ্টর সহ টি কোষের এই বিপুল বৈচিত্র্য নিশ্চিত করে যে সর্বদা কিছু কোষ থাকে যা আক্রমণকারী জীবাণুর আকার শনাক্ত করতে সক্ষম (figure 2), যার মধ্যে ২০১৯ সালে কোভিড-১৯ মহামারী শুরু করা নতুন ভাইরাসের মতো জীবাণুও অন্তর্ভুক্ত। তবে, শরীর অনিবার্যভাবে এমন টি-কোষ রিসেপ্টরও তৈরি করে যা শরীরের নিজস্ব টিস্যুর অংশগুলির সাথে যুক্ত হতে পারে। তাহলে, কোন বিষয়টি টি কোষগুলিকে প্রতিকূল জীবাণুর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাতে উৎসাহিত করে কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোষগুলির প্রতি নয়?
শরীরের নিজস্ব টিস্যু শনাক্তকারী টি কোষের নির্মূল
১৯৮০-এর দশকে গবেষকরা দেখেন, টি কোষ যখন থাইমাসে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, তখন তারা এক ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। যে কোষগুলো শরীরের নিজস্ব প্রোটিনকে আক্রমণ করতে পারে, সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায় - এটিই কেন্দ্রীয় সহনশীলতা (চিত্র ৩)।
তবে কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেছিলেন যে, এমন কিছু বিশেষ কোষও আছে যারা এই ফাঁকফোকর পেরিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক টি কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা এই কোষকে বলেছিলেন ‘দমনকারী টি কোষ’। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় প্রমাণের ঘাটতির কারণে এই ধারণা বাতিল হয়ে যায়।
শিমন সাকাগুচির অন্তর্দৃষ্টি: প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রহরী
তবে একজন গবেষক, জাপানের নাগোয়ায় আইচি ক্যান্সার সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের শিমন সাকাগুচি, প্রচলিত ধারার বিপরীতে গবেষণা চালিয়েছিলেন।
তিনি টি কোষের বিকাশে থাইমাসের ভূমিকা বোঝার জন্য সদ্যোজাত ইঁদুরের শরীর থেকে থাইমাস গ্রন্থি অপসারণ করে পরীক্ষা চালান। অনুমান করা হয়েছিল, এতে ইঁদুরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি জন্মের তিন দিন পর অস্ত্রোপচার করা হয়, দেখা যায় উল্টো ঘটনা - প্রতিরোধ ক্ষমতা অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ইঁদুরগুলো নানা অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়।
এই ঘটনাটি আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে সাকাগুচি জেনেটিক্যালি অভিন্ন ইঁদুরের পূর্ণবয়স্ক টি কোষ আলাদা করে থাইমাসবিহীন ইঁদুরের শরীরে প্রতিস্থাপন করেন আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেল, এই টি কোষগুলো ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করছে! (চিত্র ৪) তখনই তিনি অনুমান করেন - শরীরে এমন এক ধরনের কোষ থাকা উচিত, যা অন্য টি কোষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এক নতুন শ্রেণির টি কোষের সন্ধান
গবেষকরা টি কোষের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে কোষের পৃষ্ঠে থাকা প্রোটিন ব্যবহার করেন। সহায়ক টি কোষে থাকে CD4 প্রোটিন, আর ঘাতক টি কোষে CD8 প্রোটিন।
সাকাগুচির পরীক্ষায় দেখা যায়, যে কোষগুলো ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করেছিল, সেগুলির পৃষ্ঠে ছিল CD4 প্রোটিন - অর্থাৎ সহায়ক টি কোষ। সাধারণত এই কোষগুলো প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করে, কিন্তু তাঁর পরীক্ষায় সেটি নিয়ন্ত্রিত ছিল। তাই তিনি ধারণা করেন, CD4 বহনকারী টি কোষের অবশ্যই একাধিক ধরনের রূপ থাকবে।
দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার পর, ১৯৯৫ সালে তিনি দ্য জার্নাল অফ ইমিউনোলজি-তে প্রকাশ করেন যে এই বিশেষ ধরনের টি কোষ কেবল CD4 নয়, বরং CD25 প্রোটিনও বহন করে (চিত্র ৫)। এই নতুন শ্রেণিকে তিনি নাম দেন নিয়ন্ত্রক টি কোষ।
তবে অনেকে তখনও এর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। পরবর্তীতে মেরি ই. ব্রানকো ও ফ্রেড র্যামসডেল তাঁর আবিষ্কারকে আরও গভীর প্রমাণ দেন। এখানেই শুরু হয় স্কার্ফি ইঁদুরের অদ্ভুত গল্প।
স্কার্ফি ইঁদুরের গল্প - এক রহস্যময় জিনের সূত্র
১৯৪০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি রাজ্যের ওক রিজ ল্যাবরেটরিতে বিকিরণ সংক্রান্ত পরীক্ষায় এক অদ্ভুত প্রজাতির পুরুষ ইঁদুর জন্ম নেয়। তাদের ত্বক ছিল খসখসে ও আঁশযুক্ত, প্লীহা ও লসিকা গ্রন্থি ছিল অস্বাভাবিকভাবে বড় এবং তারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাঁচত। এই প্রজাতির নাম দেওয়া হয় স্কার্ফি।
আণবিক বংশগতিবিজ্ঞান তখনো এতোটা বিকাশ ঘটেনি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, রোগটির কারণ একটি এক্স-ক্রোমোজোমে অবস্থিত পরিব্যক্তি। পুরুষ ইঁদুরদের অর্ধেকই এতে আক্রান্ত হয়, আর স্ত্রী ইঁদুররা বেঁচে যায়, কারণ তাদের দুইটি এক্স-ক্রোমোজোমের একটিতে সুস্থ ডিএনএ থাকে। এভাবে স্ত্রী ইঁদুরগুলি স্কার্ফি পরিব্যক্তিটি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণ করে।
১৯৯০-এর দশকে যখন জিনোম বিশ্লেষণের প্রযুক্তি উন্নত হয়, গবেষকরা অনুসন্ধান শুরু করলেন কেন পুরুষ স্কারফি ইঁদুরগুলো এত অসুস্থ হয়ে যায়। দেখা গেল যে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ টিস্যু ধ্বংসকারী টি কোষ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছিল। কোনো কারণে স্কার্ফি পরিব্যক্তিটি প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের বিদ্রোহ সৃষ্টি করছিল।
ব্রানকো ও র্যামসডেলের অনুসন্ধান - মিউটেন্ট জিনের খোঁজে
বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক কাইরোসায়েন্সে কর্মরত মেরি ব্রানকো ও ফ্রেড র্যামসডেল এই পরিব্যক্তিতে গভীর আগ্রহী ছিলেন। তাঁরা মনে করেন, যদি স্কার্ফি ইঁদুরের রোগের আণবিক রহস্য বোঝা যায়, তবে অটোইমিউন রোগগুলির উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যাবে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন স্কার্ফি ইঁদুরের মিউট্যান্ট জিন শনাক্ত করবেন। কিন্তু তখন এটি ছিল খড়ের গাদা থেকে সূঁচ খোঁজার মতো কঠিন কাজ - কারণ ইঁদুরের এক্স-ক্রোমোজোমে প্রায় ১৭ কোটি বেস জোড়া নিউক্লিওটাইড রয়েছে।
ম্যাপিংয়ে দেখা গিয়েছিল যে স্কার্ফি পরিব্যক্তি এক্স-ক্রোমোজোমের প্রায় মধ্যভাগে অবস্থান করছে। ব্রানকো এবং র্যামসডেল সম্ভাব্য এলাকাটি প্রায় ৫০০,০০০ নিউক্লিওটাইডে সংকুচিত করতে সফল হন। এরপর তারা সেই এক্স-ক্রোমোজোমের অংশটি বিস্তারিতভাবে ম্যাপ করার বিশাল কাজটি শুরু করেন। এই কাজটি করতে অনেক সময় লেগেছিল। যখন ব্রানকো এবং র্যামসডেল শেষ করলেন, তখন তারা নিশ্চিত করতে পারলেন যে ওই এলাকায় ২০টি সম্ভাব্য জিন রয়েছে। তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ছিল সুস্থ ইঁদুর এবং স্কার্ফি ইঁদুরগুলিতে এই জিনগুলির তুলনা করা। তারা একটির পর একটি জিন পরীক্ষা করলেন এবং বিশতম এবং শেষ জিনটিতে তারা অবশেষে স্কার্ফি পরিব্যক্তিটি খুঁজে পেয়েছিলেন। (চিত্র ৬)
এটি পূর্বে অজানা একটি জিন, তবে ‘ফর্কহেড বক্স’ বা FOX জিন পরিবারভুক্ত, যা অন্য জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা এই নতুন জিনটির নাম দেন Foxp3।
আবিষ্কার উন্মোচন করল মানব রোগের রহস্য
ব্রানকো ও র্যামসডেল তাদের কাজের সময় সন্দেহ করা শুরু করেছিলেন যে একটি বিরল অটোইমিউন রোগ IPEX, যা এক্স-ক্রোমোজোমের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেটি স্কার্ফি ইঁদুরের রোগের মানব রূপ হতে পারে। নতুন আবিষ্কৃত জিনের তথ্য সংরক্ষণকারী ডাটাবেস খুঁজে তারা মানবদেহের Foxp3-এর সমতুল্য জিন শনাক্ত করেন। বিশ্বজুড়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায়, তারা IPEX-এ আক্রান্ত ছেলেদের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনাগুলো ম্যাপ করার পর তারা সত্যিই FOXP3 জিনে ক্ষতিকারক পরিব্যক্তি খুঁজে পান।
২০০১ সালে নেচার জেনেটিক্স-এ প্রকাশিত এই ফলাফলে দেখা যায়, স্কার্ফি ইঁদুর ও IPEX রোগের আণবিক ভিত্তি এক ও অভিন্ন। এতে স্পষ্ট হয় - FOXP3 জিনই সাকাগুচির আবিষ্কৃত নিয়ন্ত্রক টি কোষের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে।
নিয়ন্ত্রক টি কোষ - শরীরের নিরাপত্তা রক্ষী
দুই বছর পর শিমন সাকাগুচি এবং অন্যান্য গবেষকরা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে FOXP3 জিনটি নিয়ন্ত্রক টি কোষের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই কোষগুলি অন্যান্য টি কোষকে ভুলবশত শরীরের নিজস্ব টিস্যুতে আক্রমণ না করার জন্য বাধা দেয় (চিত্র ৭), যা প্রান্তিক রোগপ্রতিরোধ সহনশীলতার জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও, নিয়ন্ত্রক টি কোষ নিশ্চিত করে যে, আক্রমণকারী জীবাণু ধ্বংসের পর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিসক্রিয় হয়ে না থাকে।
এই আবিষ্কার সম্ভাব্য নতুন চিকিৎসা-পদ্ধতির উন্নয়নে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টিউমার প্রায়ই বিপুল সংখ্যক নিয়ন্ত্রক টি কোষ আকর্ষণ করে, যা তাদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। গবেষকরা এখন এই ‘প্রতিরক্ষার প্রাচীর’ ভাঙার উপায় খুঁজছেন, যাতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা টিউমারের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়তে পারে।
অন্যদিকে, অটোইমিউন রোগগুলিতে গবেষকরা চেষ্টা করছেন নিয়ন্ত্রক টি কোষের সংখ্যা বাড়াতে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীদের ইন্টারলিউকিন-২ দেওয়া হচ্ছে, যা এই কোষগুলির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। তাঁরা আরও যাচাই করছেন যে, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও ইন্টারলিউকিন-২ কার্যকর হতে পারে কিনা।
আরেকটি কৌশলে গবেষকরা রোগীর শরীর থেকে নিয়ন্ত্রক টি কোষ আলাদা করে পরীক্ষাগারে বৃদ্ধি করছেন, পরে তা পুনরায় শরীরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যাতে রোগীর দেহে এই কোষের সংখ্যা বাড়ে। কিছু ক্ষেত্রে, টি কোষের পৃষ্ঠে বিশেষ অ্যান্টিবডি সংযোজন করা হয়, যা ঠিকানার লেবেলের মতো কাজ করে - ফলে গবেষকরা এগুলোকে নির্দিষ্ট অঙ্গে পাঠাতে পারেন, যেমন প্রতিস্থাপিত যকৃত বা কিডনিতে এবং সেগুলোকে প্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারেন।
এই সমস্ত গবেষণা আমাদের দেখিয়েছে, মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। মেরি ই. ব্রানকো, ফ্রেড র্যামসডেল এবং শিমন সাকাগুচির আবিষ্কার কেবল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, মানবকল্যাণের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। তাঁদের কাজের ফলেই আজ আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি - কীভাবে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অটোইমিউন রোগ, ক্যান্সার ও প্রতিস্থাপনজনিত জটিলতা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।
বিজ্ঞানীদের পরিচয়
মেরি ই. ব্রানকো, জন্ম ১৯৬১। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, প্রিন্সটন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি। ইনস্টিটিউট ফর সিস্টেমস বায়োলজি, সিয়াটল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার।
ফ্রেড র্যামসডেল, জন্ম ১৯৬০। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস এঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৮৭ সালে পিএইচডি। সোনোমা বায়োথেরাপিউটিক্স, সান ফ্রান্সিসকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা।
শিমোন সাকাগুচি, জন্ম ১৯৫১। কিয়োটো ইউনিভার্সিটি, জাপান থেকে ১৯৭৬ সালে এমডি এবং ১৯৮৩ সালে পিএইচডি। ওসাকা ইউনিভার্সিটি, জাপান-এর ইমিউনোলজি ফ্রন্টিয়ার রিসার্চ সেন্টারে বিশিষ্ট অধ্যাপক।
