THE CREATION OF THE UNIVERSE - George Gamow; অনুবাদ - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার

THE CREATION OF THE UNIVERSE- George Gamow; অনুবাদ - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার

THE CREATION OF THE UNIVERSE

by
George Gamow

অনুবাদ
মোহাম্মদ আবদুল জব্বার

সূচিপত্র

সূচনা
প্রথম অধ্যায়: বিবর্তন বনাম স্থায়িত্ব
দ্বিতীয় অধ্যায়: বিশাল সম্প্রসারণ
তৃতীয় অধ্যায়: পরমাণু সৃষ্টি
চতুর্থ অধ্যায়: ঘনীভবনের গঠনক্রম
পঞ্চম অধ্যায়: তারাসমূহের ব্যক্তিগত জীবন
সমাপ্তি
পরিশিষ্ট

সূচনা

মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য মানুষের মনকে, ইতিহাসের আরম্ভ হইতেই, গভীরভাবে আলোড়িত করিয়াছে। আদিম মানুষের নিকট বিশ্বের উৎপত্তি কোন দেবতার সৃষ্টিকার্যের সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই দেবতা আলো হইতে অন্ধকারকে পৃথক করিয়াছিল, আকাশের উপরে স্থির করিয়া রাখিয়াছিল এবং সেই আদিম মানুষের অতি সীমিত বিশ্বছবির সমস্ত বিশেষত্বই ছিল সেই দেবতার কাজ।
যতই শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীত হইতে লাগিল এবং মানুষ তাহার পরিবেশের সহিত জড়িত পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনা সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করিতে লাগিল, বিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বো ততই বিজ্ঞানসম্মত রূপ ধারণ করিতে লাগিল। বিশ্বের জন্ম যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কারণেই হইয়াছিল, এইরূপ চিন্তা করিবার সঙ্গে সূচিত বৈজ্ঞানিক যুগের সঙ্গে বাফন, কান্ট এবং ল্যাপ্লাসের নাম বিশেষভাবে জড়িত। তদানীন্তন তত্ত্ব কেবল সৌরজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে এই তত্ত্বের বহুবিধ পরিবর্তন সাধিত হয় এবং বর্তমানে কার্ল ফন বাইজস্যাকের এবং জেরার্ড পি. কাইপার যুক্তিসঙ্গতরূপে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি গ্রহ গঠনতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।
ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিদ্যা একটি নুতন দিগন্ত উন্মুক্ত করিয়াছে এবং বিশ্বের অতি সাধারণ একটি দুর্ঘটনার জন্য গ্রহ সৃষ্টির সেই পুরাতন মতবাদকে বিশ্ব-বিবর্তনের একটি ব্যাপকতর কাঠামোর অন্তর্ভূক্ত অতি সামান্য একটি ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে। অতি শক্তিশালী দূরবীক্ষণের সাহায্যে ছায়াপথ নামে পরিচিত যে সমস্ত তারা পরিবারকে বিশাল বিস্তৃত বিশ্বে ছড়াইয়া থাকিতে দেখা যায, তাহাদের সৃষ্টি ও বিবর্তন ব্যাখ্যাই বর্তমান বিশ্ব সৃষ্টি তত্ত্বের প্রধান প্রশ্ন। বিপুল পরিমাণের এই বিশ্ব বিবর্তন সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করিবার প্রধান উপকরণ পাওয়া যায়, আমেরিকার জ্যোতির্বিদ এডুইন পি. হাবল কর্তৃক মাত্র পচিঁশ বৎসর পূর্বের একটি আবিষ্কার হইতে। হাবল আবিষ্কার করেন যে মহাশূণ্যের অধিবাসী ছায়াপথসমূহ সর্বদা দ্রুত অপসরণশীল অবস্থায় (সম্প্রসারণশীল বিশ্ব) আছে। ইহা হইতে বুঝিতে পারা যায় যে কোন এক সময়ে বিশ্বের সমস্ত পদার্থ সমাহারে সঙ্কুচিত একটি অবিচ্ছিন্ন তপ্ত গ্যাসপিন্ড মাত্র ছিল। বেলজিয়ামের কল্পনাবিলাসী বৈজ্ঞানিক আবে জর্জেস এডোয়ার্ড লামেটার সর্বপ্রথম, সম্প্রসারণের পরিলক্ষিত ঘটনাসমূহের সহিত আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কতকগুলি গাণিতিক ফলের নিকট সম্বন্ধ আবিষ্কার করেন। সমসস্ত আদিম পদার্থের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের যে বিভেদীকরন সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহার ফলেই যে আমাদের পরিচিত বিশ্বের গঠন অত্যন্ত জটিল, সেই ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তিনি একটি সুদূরপ্রসারী কার্যক্রম গ্রহণ করেন। যদি কখনও এই কার্যক্রম বিশদভাবে সম্পন্ন করা যায়, তাহা হইলে এমন পরিপূর্ণ বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব পাওয়া যাইবে, যাহা দ্বারা প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর দৃশ্য জটিলতাসমূহকে যথাসম্ভব ক্ষুদ্রতম সংখ্যক আদি স্বীকার্য বিষয়ে পরিণত করা যাইবে এবং এইভাবে বিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্য সাধিত হইবে। যদিও এই কার্যক্রম সম্পূর্ণ হইবার অনেক দেরী আছে, তথাপি ইহার বিভিন্ন অংশে যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হইয়াছে এবং ইতিমধ্যেই সমাপ্তি দৃষ্টিগোচর হইতেছে।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে বর্তমানে যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক এই ক্ষেত্রে কাজ করিতেছেন, তাঁহাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিতর যথেষ্ট মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। ইহাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে কয়েক শত কোটি বৎসর পূর্বের অতি সঙ্কুচিত সমসত্ব পদার্থের ক্রমাগত বিবর্তন প্রক্রিয়া হইতেই বিশ্ব বর্তমান অবস্থায় উন্নীত হইয়াছে। ইহাই ‌’আরম্ভ-প্রকল্প’। আবার অন্য অনেকে মনে করেন যে বিশ্ব বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, অনন্তকাল হইতে মোটামুটি সেই অবস্থাতেই ছিল। ইহাই ‘স্থিতাবস্থা-প্রকল্প’। বিশ্ব বিবর্তনের শেষোক্ত মতবাদের প্রবক্তাদের ভিতরে একজন হইলেন রাশিয়ার জ্যোতির্বিদ ভরোনৎসফ-ভেলিয়ামিনফ। তর্কশাস্ত্রীয় জড়বাদ দর্শনের জন্যই তিনি এই মতবাদ গ্রহণ করিতে বাধ্য হন বলিয়া মনে হয়। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হয়েলও একইরূপ মতবাদ পোষণ করেন। অবশ্য তাঁহার মতবাদের ধারা অন্যরূপ এবং তাঁহার এই মতবাদ গ্রহণের কারণও সম্পূর্ণ পৃথক। আন্ত-ছায়াপথের মহাশূণ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে পদার্থ সৃষ্টি হইতেছে, এই প্রকল্পের সাহায্যে তিনি তাঁহার তথাকথিত বিশ্বের স্থিতাবস্থার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই দুইটি মতবাদের কোনটি শেষ পর্যন্ত মত্য বলিয়া প্রমানিত হইবে, তাহা বলিবার সময় এখনও আসে নাই। এই গ্রন্থের প্রধান উদ্দেশ্য হইতেছে, ‘আরম্ভ-প্রকল্পে’র সমর্থনে যুক্তি প্রদর্শন করা এবং ‘স্থিতাবস্থা-প্রকল্পে’র প্রবক্তাদের দাবীকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা।
আশা করা যায় যে এই গ্রন্থ, এই বিষয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যরত বৈজ্ঞানিকদের নিকট পর্যাপ্ত পরিমাপ হইবে এবং একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্ব-সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে উৎসাহী জনসাধারণের কাজে আসিবে।

প্রথম অধ্যায়:

বিবর্তন বনাম স্থায়িত্ব

বিশ্ব-সৃষ্টির মূল সমস্যা আলোচনার পূর্বে দেখিতে হইবে যে এইরূপ আলোচনার মোটেই কোন প্রয়োজন আছে কিনা। এমন কি, সত্য হইতে পারে না যে বিশ্ব অনন্তকাল হইতে বিরাজমান এবং আমরা বিশ্বকে বর্তমানে যেমন জানি, তাহার সামান্য দুই একটা পরিবর্তন ছাড়া, বিশ্ব প্রধানত সেই একইভাবে আছে? আমাদের বিশ্বের বর্তমান অবস্থার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিভিন্ন মূল অংশের এবং অবয়বসমূহের সম্ভাব্য বয়স সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করিতে পারিলেই এই প্রশ্নের সর্বাপেক্ষা সদুত্তর দেওয়া যাইতে পারে।

পরমানুর বয়স
উদাহরণস্বরূপ কোন পদার্থবিদ বা রসায়নবিদকে আমরা জিজ্ঞাসা করিতে পারি, ‘যে পদার্থ হইতে আমাদের বিশ্ব তৈরি হইয়াছে সেই পদার্থ গঠনকারী পরমানুসমূহের বয়স কত?’ মাত্র অর্ধ শতাব্দী পূর্বে তেজস্ক্রিয়তা এবং ইহার ব্যাখ্যাস্বরূপ অস্থায়ী পরমানুর স্বতঃক্ষয় ইহা আবিষ্কারের পূর্বে এইরূপ প্রশ্নের বিশেষ কোন অর্থ ছিল না। পূর্বে মনে করা হইত যে পদার্থের মৌলিক অবিভাজ্য অংশই পরমানু এবং অনন্তকাল ধরিয়া ইহারা এইভাবেই আছে। কিন্তু যখন স্বাভাবিক তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থের অস্তিত্ব জানা গেল তখন অবস্থা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইল। ইহা স্পষ্ট বুঝিতে পারা গেল যে যদি অতি প্রাচীনকালে তেজস্ক্রিয় পদার্থসমূহের পরমানু গঠিদ হইয়া থাকিত, তাহা হইলে এতদিনে তাহা সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া অদৃশ্য হইয়া যাইত। এইভাবে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থের পরিলক্ষিত আপেক্ষিক প্রাচুর্য তাহাদের সৃষ্টিকাল সম্বন্ধে আমাদিগকে কিছু ইঙ্গিত দিতে পারে। সর্বপ্রথমে আমরা লক্ষ্য করি যে বিসমাথ, পারা অথবা সোনা ইত্যাদি ভারী মৌলিক পদার্থ অপেক্ষা থোরিয়াম ও ইউরেনিয়ামের সাধারণ একরূপী U238 কম প্রচুর নহে। থোরিয়াম ও সাধারণ ইউরেনিয়ামের অর্ধ-জীবনকাল যথাক্রমে ১.৪x১০১০ এবং ৪.৫x১০১০ বৎসর। অতএব সহজেই সিদ্ধান্ত করা যায যে এই সমস্ত পরমানু গঠন কয়েক শত কোটি বৎসর পূর্বে হয় নাই। অন্যদিকে বর্তমানে সকলেই যেমন জানে যে ইউরেনিয়ামের বিভাজনযোগ্য একরূপী U235 অত্যন্ত দুস্প্রাপ্য; প্রধান একরূপীর ইহা ০.৭ ভাগ মাত্র। এইরূপ না হইলে, মানহাটান পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পিপের ভিতরে মাছ ধরিবার মতই সহজ হইয়া পড়িত। U235 এর অর্ধ-জীবনকাল U238 এর অর্ধ-জীবনকাল অপেক্ষা যথেষ্ট পরিমানে কম।, মাত্র প্রায় ০.৯x১০ বৎসর। যেহেতু বিভাজনযোগ্য ইউরেনিয়ামের পরিমাণ প্রতি ০.৯x১০ বৎসরে প্রায় অর্ধেকে পরিণত হয়, অতএব যদি আদিতে উভয় প্রকার একরূপীই তুলনামূলক পরিমাণে বিদ্যমান থাকিত, তাহা হইলে ইহার বর্তমান দুষ্প্রাপ্য অবস্থায় উপনীত হইতে এইরূপ প্রায় সাতটি কালের অর্থাৎ x১০ বৎসরের প্রয়োজন হইয়াছে।
একইভাবে আরো কয়েকটি তেজ্রস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থের, যেমন স্বাভাবিকভাবে তেজস্ক্রিয় পটাশিয়ামের, অস্থায়ী একরূপী অত্যন্ত অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। ইহা হইতে অনুমান করা যায় যে কয়েক শত কোটি বৎসরের ধীর ক্ষয় প্রাপ্তির ফলে এই সমস্ত একরূপীর পরিমাণ যথেষ্ট হ্রাস পাইয়াছে। অবশ্য পূর্ব হইতেই এইরূপ সিদ্ধান্ত করিবার কোন কারণ নাই যে কোন একটি প্রদত্ত মৌলিক পদার্থের সমস্ত একরূপীই প্রথমে একই পরিমাণে উৎপন্ন হইয়াছিল। কিন্তু পরিণতির সমতুল্যতা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা, ইহা এই সমস্ত কেন্দ্রকণা গঠনের একটি আনুমানিক সময় নির্দেশ করে। অধিকন্তু ১০ বৎসরের যথেষ্ট কম অংশের অর্ধ-জীবনকাল বিশিষ্ট কোন একরূপী প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না; যদিও আণবিক পাইলের সাহায্যে কৃত্রিম উপায়ে এই প্রকার একরূপী উৎপন্ন করা যাইতে পারে। ইহাতেও নির্দেশ করে যে বর্তমান সময়ের কয়েক শত কোটি বৎসর পূর্বেও পরমাণু জাতির সৃষ্টি হয় নাই। অতএব কয়েক শত কোটি বৎসর পূর্বে যে অসাধারণ পরিবেশ বিদ্যমান ছিল, তাহাতে তেজস্ক্রিয় পরমাণু ও তৎসহ অন্যান্য স্থায়ী পরমাণু গঠিত হইয়াছিল, এইরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার পক্ষে অত্যন্ত সবল যুক্তি আছে।

 

শিলার বয়স
আমাদের অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা ভূতত্ত্ববিদকে জিজ্ঞাসা করিতে পারি ‘আমাদের ভূ-ত্বক যে শিলাদ্বারা গঠিত তাহার বয়স কত?’ তথাকথিত তেজস্ক্রিয় ঘড়ি প্রণালীর সাহায্যে বিভিন্ন শিলার বয়স, অর্থাৎ গলিত অবস্থা হইতে ঘণীভূত হইয়া কঠিন অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হইয়াছে তাহা, অতি সূক্ষ্মভাবে নির্ণয় করা যাইতে পারে। লর্ড রাদারফোর্ড সর্বপ্রথম এই প্রণালী আবিষ্কার করেন। পিচব্লেন্ড ও ইউরেনিনাইটের মত বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থের ভিতরে সীসার পরিমাণ নির্ণয়ের উপর এই প্রণালী প্রতিষ্ঠিত। এখানে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হইতেছে যে তেজস্ক্রিয় পদার্থের স্বাভাবিক ক্ষয়প্রাপ্তির ফলে তথাকথিত রেডিওজেনিক সীসা উৎপন্ন হয়। থোরিয়ামের ক্ষয়প্রাপ্তিতে সীসার একরূপী Pb208 উৎপন্ন হয় এবং ইউরেনিয়ামের দুইটি একরূপী Pb207Pb206 উৎপন্ন হয়। এই সমস্ত রেডিওজেনিক সীসার একরূপী, তাহাদের সহচর সাধারণ সীসা Pb204 হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ সীসা Pb204 কোন তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয়প্রাপ্তির ফলে উৎপন্ন হয় না।
যতক্ষণ শিলাপদার্থ গলিত অবস্থায় থাকে, যেমন পৃথিবীর অভ্যন্তরে আছে, ততক্ষণ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া নবগঠিত সীসাকে আদি পদার্থ হইতে পৃথক করিয়া রাখিতে পারে। কিন্তু পদার্থ কঠিন হইয়া আকরিক গঠন করিবার পর, রেডিওজেনিক সীসা তাহার গঠন স্থানেই থাকিয়া যায়। শিলা কঠিন হইবার পর যত বেশী সময় অতিবাহিত হয়, কোন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ তত অধিক পরিমাণ সীসা অবক্ষেপণ করে। অতএব অবক্ষেপিত রেডিওজেনিক সীসার একরূপী এবং সীসা গঠনকারী তেজস্ক্রিয় পদার্থের আপেক্ষিক পরিমাণ (অর্থাৎ Pb208/Pb232, Pb207/Pb235 দুইটি অনুপাত) নির্ণয় করলে এবং অনুরূপ ক্ষয়ক্ষতির হার জানা থাকিলে কোন তেজস্ক্রিয় আকরিক গঠনের তিনটি নিরপেক্ষ (এবং সাধারণত অভিন্ন) সময়ের হিসাব পাওয়া যায়। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগের তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপে এই প্রণালী প্রয়োগ করিলে, নীচের ছকে প্রদত্ত ফলের অনুরূপ ফল পাওয়া যায়।

বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থের বয়স:
খনিজ পদার্থ                         প্রাপ্তিস্থান    ভূ-তাত্ত্বিক যুগ    আনুমানিক বয়স কোটি বৎসর)
পিচব্লেন্ড কলোরাডো             (আমেরিকা)   তৃতীয় স্তর                        ৫.৮
পিচব্লেন্ড বোহেমিয়া               (ইউরোপ)   কার্বোনিফেরাস                   ২১.৫
পিচব্লেন্ড বেলজিয়ান কঙ্গো       (আফ্রিকা)    ক্যাম্ব্রিয়ান-পূর্ব                   ৫৮.০
পিচব্লেন্ড গ্রেটবীয়ার লেক         (কানাডা)    ক্যাম্ব্রিয়ান-পূর্ব                   ১৩৩.০
ইউরানাইট কারেলিয়া            (রাশিয়া)      ক্যাম্ব্রিয়ান-পূর্ব                  ১৭৬.৫
ইউরানাইট মানিটোবা           (কানাডা)     ক্যাম্ব্রিয়ান-পূর্ব                  ১৯৮.৫
মোনাজাইট রোডেশিয়া         (আফ্রিকা)      ক্যাম্ব্রিয়ান-পূর্ব                   ২৭১.০

উপরের ছকের শেষোক্ত খনিজ পদার্থই এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বাপক্ষো প্রাচীন খনিজ পদার্থ এবং ইহার বয়স হইতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি যে ভূ-ত্বকের বয়স অন্ততপক্ষে.x১০৯ বৎসর।
ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ আর্থার হোমস্ অধুনা একটি অধিকতর ব্যাপক প্রণালীর প্রস্তাব দিয়েছেন। বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ গঠনেরও পূর্ব হইতে এই প্রণালী প্রয়োগ করিতে হয়। এবং ইহাতে পৃথিবী গঠনকারী পদার্থসমূহের বয়সের নির্ভূল হিসাব পাওয়া যায় বলিয়া দাবী করা হয়। পাশ্চাত্যের একজন অন্যমনস্ক গো-পালকের গল্প দিয়া হয়তো সহজে এই প্রণালীর উদাহরণ দেওয়া যাইত পারে। ঐ গো-পালকের মনে আছে যে বসন্তকালের কোন একদিনে সে তাহার খামারের সমস্ত গরুকে গোচারণের মাঠে বাহির করিয়া দিয়াছিল। কিন্তু বিশেষ কোন্ দিনে সে উহা করিয়াছিল, তাহা সে কিছুতেই মনে করিতে পারে না। তাহার আরো মনে আছে যে গ্রীষ্মকালের বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন গোচারণভূমি হইতে গরুগুলিকে সংগ্রহ করিয়া সে নতুন তৈরি খোঁয়াড়ে (প্রতি চারণভূমিতে একটি খোঁয়াড়) তুলিয়া রাখে। কিন্তু এই সমস্ত দিনও সে ভুলিয়া গিয়াছে। সে পর্যায়ক্রম পুনর্গঠন করিবার তাহার কোন উপায় আছে কি?
হ্যাঁ, চারণভূমিতে ও খোঁয়াড়ে তাহার গরুগুলি যে গোবর ত্যাগ করিয়াছে, তাহা ঘাঁটাঘাঁটি করিতে যদি তাহার আপত্তি না থাকে, তাহা হইলে আছে। পাঠক হয়তো অনুমান করিতে পারিয়াছেন যে এখানে গোবরকে ক্ষয়শীল ইউরেনিয়াম দ্বারা গঠিত সীসার প্রতীক রূপে ব্যবহার করা হইয়াছে এবং গরুর পাল খোঁয়াড়ে তুলিয়া রাখা বিভিন্ন শিলাতে তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ গঠন নির্দেশ করে। প্রত্যেক খোঁয়াড়ে সঞ্চিত গোবর ত্যাগের হার দ্বারা ভাগ করিলে গরুগুলিকে খোঁয়াড়ে তুলিয়া রাখিবার আনুমানিক সময় সহজে নির্ণয় করা যায়। তেজস্ক্রিয় ঘড়ি প্রণালী দ্বারা শিলার বয়স নির্ণয়ও ঠিক এইরূপ করা হয়। কিন্তু গরুগুলিকে ঠিক কোন্ দিন চারণভূমিতে ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল, কোন্ সময়ে তেজস্ক্রিয় পরমানু গঠিত হইতে আরম্ভ হইয়াছিল, তাহা নির্ণয়ের উপায় কি?
প্রথম দৃষ্টে মনে হয় যে সমস্ত গরু খোলা মাঠে ঘাস খাইবার সময় যে গোবর ত্যাগ করিয়াছিল তাহা সম্পূর্ণ পরিমাণে সংগ্রহ করিয়া ঠিক পূর্ববর্ণিত প্রণালী প্রয়োগ করা সম্ভব হইতে পারে। কিন্তু উহা দ্বারা সঠিক উত্তর পাওয়া নাও যাইতে পারে। কেননা, গরুগুলিকে ছাড়িয়া দেওয়ার পূর্বেই হয়তো ঐ ভূমিতে কোন আদিম গোবর ছিল। সমস্ত পরমানু সৃষ্টির যুগে ইউরেনিয়ামের সঙ্গে এক সময়ে যে সীসার সৃষ্টি হইয়াছিল এবং যাহা পরবর্তী যুগে ইউরেনিয়ামের ক্ষয়প্রাপ্তির ফলে উৎপন্ন হয় নাই, এখানে তাহাই নির্দেশ করিতেছে। অবশ্য বিভিন্ন খোঁয়াড়ের বয়স নির্ণয়ে এই গোবর প্রণালী ব্যবহারের বিরুদ্ধেও একই আপত্তি তোলা যাইত। কিন্তু খোঁয়াড়ের জায়গা অল্প; সামান্য কয়েকদিনের ভিতরেই খোঁয়াড়ে গরু যে পরিমাণ গোবর ত্যাগ করিবে, তাহার তুলনায় আদিম গোবরের পরিমাণকে অনায়াসে বাদ দেওয়া যাইতে পারে। অন্যদিকে উন্মুক্ত মাঠের অবস্থা সম্পূর্ণ পৃথক এবং নির্ণেয় ফলকে সেই আদিম গোবরের অস্তিত্ব যথেষ্টরূপে প্রভাবান্বিত করিতে পারে।
প্রশ্নটিকে আরও বিশদভাবে বিবেচনা করিয়া সমস্ত চারণভূমিতে আদিম গোবরের পরিমাণ একই সমান মনে করিলে (আদি পরমাণু সৃষ্টির সমাহার প্রকল্প) আমরা বুঝিতে পারি, যে সমস্ত চারণভূমি হইতে গরুগুলিকে তাড়াইয়া আগে খোঁয়াড়ে তোলা হইয়াছে, সেই সমস্ত চারণভূমিতে গোবরের পরিমাণ কম হইবে। (প্রকৃতপক্ষে, ভূতাতত্ত্বিকগণ অধিক ভূ-তাত্ত্বিক বয়সের শিলাতে কম পরিমাণ রেডিওজেনিক সীসা পাইয়া থাকেন।) গরুগুলিকে খোঁয়াড়ে আবদ্ধ করিবার সময় হইতে প্রত্যেক চারণভূমিতে গোবরের যে পরিমাণের আর কোন পরিবর্তন হয় নাই তাহা দিয়া আরম্ভ করিয়া দৈনন্দিন গোবর উৎপাদন বিয়োগ করিতে করিতে চলিতে থাকিলে আমরা এমন এক সময়ে (বসন্তকালে) উপস্থিত হইব, যখন চারণভূমিতে গোবরের পরিমাণ শূণ্য ছিল। যদি কোন আদিম গোবর না থাকিত, তাহা হইলে ঐ দিনই গো-পালকের ভুলিয়া যাওয়া প্রথম দিনটি নির্দেশ করিত। কিন্তু যদি আদিম গোবর থাকিত (অবশ্য তাহার পরিমাণ অজ্ঞাত), তাহা হইলে কোন বিশেষ চারণভূমিতে এই প্রক্রিয়া উত্তর দিতে ব্যর্থ হইত। কিন্তু কয়েকটি চারণভূমি হইতে প্রাপ্ত উপাত্ত তুলনা করিলে অবস্থা সম্পূর্ণ পৃথক হয়। বিভিন্ন চারণভূমির অতীত গোবর সঞ্চয়ের ইতিহাস নির্দেশক রেখা, সাধারণভাবে বলিতে গেলে বিভিন্ন হইবে। কেননা, ভূমির আয়তন, গরুর সংখ্যা, খোঁয়াড় তৈরির দিন ইত্যাদির উপর ইহারা নির্ভর করে। কিন্তু এই রেখাগুলি একই চিত্রে (১নং চিত্র) অঙ্কন করিলে তাহারা একই বিন্দুতে ছেদ করবে।

১নং চিত্র: পাশ্চাত্যের একজন অন্যমনস্ক গো-পালক কবে তাহার গরুর পালকে চারণভূমিতে ছাড়িয়া দিয়াছিল, তাহা নির্ণয় করিতে তাহাকে কিভাবে সাহায্য করা যায়? (আর্থার হোমসের ভূতাত্ত্বিক প্রণালী)১নং চিত্র: পাশ্চাত্যের একজন অন্যমনস্ক গো-পালক কবে তাহার গরুর পালকে চারণভূমিতে ছাড়িয়া দিয়াছিল, তাহা নির্ণয় করিতে তাহাকে কিভাবে সাহায্য করা যায়? (আর্থার হোমসের ভূতাত্ত্বিক প্রণালী)

 

ইহা হইতে গরুর দলকে চারণভূমিতে ছাড়িয়া দেওয়ার সেই ভুলিয়া যাওয়া দিন এবং ঐ দিনে জমা আদিম গোবরের পরিমাণ উভয়ই পাওয়া যাইবে। বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক যুগের শিলাতে প্রাপ্ত সীসার একরূপীর আপেক্ষিক পরিমাণে এই প্রণালী প্রয়োগ করিয়া (গরুর পাল ও গোবর দ্বারা দুইটি ইউরেনিয়াম একরূপী U238 এবং U235 ও দুইটি রেডিওজেনিক সীসা একরূপী Pb206Pb207নির্দেশ করিয়া) হোমস্ দেখিতে পান যে সমস্ত রেখা .x১০ বৎসর সামগ্রিক৩ বয়স নির্দেশক বিন্দুর নিকট ছেদ করে। অতএব ইহাই আমাদের পৃথিবীর নির্ভূল বয়স। ‌

সমুদ্রের বয়স
কঠিন অবক্ষেপ সম্বন্ধে ভূতত্ত্ববিদগণের নিকট হইতে এত সাহায্য পাইবার পর আবার আমরা এই প্রশ্ন লইয়া তাঁহাদের শরণাপন্ন হইতেছি, ‌’যে সমুদ্রসমূহ পৃথিবীর এতটা অংশ জুড়িয়া আছে, তাহাদের বয়স কত?’ এক্ষেত্রে উত্তর ততটা সুনির্দিষ্ট নয়। দুই শতাব্দী পূর্বে এডমন্ড হ্যালী এই প্রণালী প্রস্তাব করেন। ইনিই ইহার নামের সহিত জড়িত ধূমকেতুর পুনরাবির্ভাবকালের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। নদী দ্বারা আনীত লবণই যে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার প্রধান কারণ, এই তথ্যের উপরেই এই প্রণালী প্রতিষ্ঠিত। আমরা জানি যে নদীর পানিতে সামান্য পরিমাণ লবণ দ্রবীভূত থাকে বলিয়া ইহার স্বাদ বৃষ্টির পানির স্বাদ হইতে পৃথক। যে সমস্ত খরস্রোতা জলপ্রবাহ ও জলস্রোত পাহাড়ের ঢালু গাত্র বহিয়া নীচে প্রবাহিত হয়, প্রধানত তাহাদের দ্বারাই পৃথিবীর শিলাগাত্রের এই সমস্ত লবণ ধৌত হইয়া যায়। সমুদ্রে আনীত নদীর পানির বাষ্পীভবন হয়। এই বাষ্প সঞ্চিত হইয়া মেঘ হয় এবং মহাদেশসমূহের উপরে একটি নিয়ত চক্রে পুনরায় বৃষ্টিরূপে পতিত হয়। লবণের বাষ্পীভবন হয় না; তাহারা সমুদ্রে সঞ্চিত হইয়া সমুদ্রের লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়াইতে থাকে। সমুদ্রসমূহের দ্রবীভূত লবণের বর্তমানে জ্ঞাত পরিমাণকে নদীসমূহ দ্বারা আনীত লবণের জ্ঞাত বাষিক পরিমাণ দ্বারা ভাগ করিলে আমরা দেখিতে পাই যে প্রতি শতাব্দীতে সমুদ্রের লবণাক্ততা শতকরা একভাগের দশ লক্ষ ভাগ বৃদ্ধি পায়। ইহা হইতে এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে ভবিষ্যতে অবস্থার কোন পরিবর্তন না হইলে প্রায় .x১০ বৎসরে সমস্ত সমুদ্রে লবণে সম্পৃক্ত (শতকরা ৩৬ ভাগ) হইবে এবং মরুসাগর বা বৃহৎ লবণ হ্রদের মত হইবে। ইহা দ্বারা ইহাও সিদ্দান্ত করা যায় যে নদীসমূহ প্রায় x১০বৎসর কার্যরত থাকিবার ফলে সমুদ্রসমূহে বর্তমান পরিমাণের (শতকরা ৩ ভাগ) লবণ সঞ্চিত হইয়াছে। এই সংখ্যা কমের দিকে; কেননা, জানা যায় যে লবণ অবক্ষেপের বর্তমান হার অত্যন্ত অধিক। তাহার কারণে, আমাদের ভূ-মন্ডলের ইতিহাসের অধিকাংশ সময় পর্যন্ত মহাদেশসমূহের উপরিভাগ একেবারে সমতল ছিল। ভূ-ত্বকের ক্রমিক সঙ্কোচনের ফলে পুরাতন পাহাড়সমূহ সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রে নিমজ্জিত হইয়াছে।, কিন্তু তখনও নতুন পাহাড়সমূহ গড়িয়া ওঠে নাই। (ভূ-তত্ত্ববিদগণ অন্ততপক্ষে এইরূপ দশটি পর্বত-উত্থান যুগ গণনা করিয়াছেন।) অনুমান করা হয় যে পৃথিবীর এইরূপ সমতল অবস্থার যুগে নদীসমূহের ভাঙ্গন-কার্য বর্তমান সময়ের এক-দশমাংশের বেশি ছিল না। ইহাতে আমাদের সমুদ্রসমূহের আনুমানিক বয়স কয়েক শত কোটি বৎসর হইবে। প্রাচীণতম শিলার বয়সের সহিত এই সংখ্যার মিল আছে।

চাঁদের বয়স
এই সমস্ত মূল্যবান তথ্যের জন্য ভূ-তত্ত্ববিদ্যাকে ধন্যবাদ জানাইয়া আমরা জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করি এবং বিভিন্ন খ-বস্তুর বয়স জিজ্ঞাসা করি। ‘চাঁদের বয়স কত?’ এই প্রশ্ন দিয়া আরম্ভ করা যাক। আমরা প্রথমে জানিতে পারি যে আমাদের রাত্রির - রাণী বর্তমানে যেখানে আছে, চিরকাল সেখানে ছিল না। অতি সুদূর অতীতে ইহা পৃথিবীর এত নিকটে ছিল যে মাথার উপরে হাত বাড়াইয়া দিয়া ইহাকে ছোঁয়া যাইত। (অবশ্য যদি যে যুগে হাত এবং মাথাওয়ালা কোন প্রাণী থাকিত।) ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ জর্জ ডারউইনের (প্রাণিবিদ চার্লস ডারউইনের ছেলে) গবেষণাতে দেখানো হইয়াছে যে চাঁদ অনবরত পৃথিবী হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছে। পৃথিবী হইতে ইহার দূরত্ব বার্ষিক পাঁচ ইঞ্চি হারে বৃদ্ধি পায়। ইহা না বলিলেও চলে যে অতিসূক্ষ্ম কোন যন্ত্রপাতি দ্বারাই চাঁদের দূরত্বের এত সামান্য বৃদ্ধি পরিমাপ করা সম্ভব নয় এবং পরোক্ষভাবে হইলেও কোন সম্পূর্ণ বিশ্বস্তভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গিয়াছে।
এই যুক্তি বুঝিতে হইলে আমাদের মনে রাখিতে হইবে যে চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর সমুদ্রে যে বেলোর্মির সৃষ্টি হয়, তাহাতেই পৃথিবী ও চাঁদের ভিতরের মিথষ্ক্রিয়া বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়। বেলোর্মিসমূহ ভূমন্ডলের চতুর্দিকে প্রবাহিত হইবার পথে মহাদেশসমূহের বাধার সম্মুখীন হয়। মহাশূণ্যে কোন স্থির বিন্দু হইতে আমরা যদি পৃথিবী ও চাঁদকে একত্রে দেখিতে পাইতাম, তাহা হইলে একটি চাকার অক্ষ যেমন দইটি ব্রেক-সু এর মাঝখানে ঘুরিতে থাকে, আমাদের পৃথিবীকেও তেমনি দুটি বেলোর্মি স্ফীতির মাঝখানে আবর্তিত হইতে দেখা যাইত। ইহাতে আমরা আশা করিতে পারি যে পৃথিবীর আবর্তন গতি ক্রমশ কমিতে থাকিবে এবং তাহাতে ক্রমশ আমাদের দিনের দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি করিবে। ‘কৌণিক ভরবেগের নিত্যতা’ নামে পরিচিত গতিবিদ্যার একটি প্রধান বিধি অনুসারে দিনের দের্ঘ্য বৃদ্ধির ফলে চাঁদের আবর্তনকালেরও (মাস) বৃদ্ধি পাইবে এবং পৃথিবী হইতে ইহার দূরত্ব ক্রমশ বাড়িতে থাকিবে।
হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে যে পৃথিবী হইতে চাঁদের দূরত্বের পূর্ববর্ণিত বৃদ্ধি ছাড়াও, বেলোর্মির ঘর্ষণের ফলে, প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য এক সেকেন্ডের এক হাজার ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি পাইবে এবং মাসের দৈর্ঘ্য এক সেকেন্ডের আট ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি পাইবে। দিন ও মাসের দৈর্ঘ্যের গণনাপ্রাপ্ত এই পরিবর্তন যদিও অতি সামান্য বলিয়া মনে হয়, কিন্তু প্রত্যক্ষ জ্যোতির্বিদীয় পর্যবেক্ষণ দ্বারা ইহার সত্যতা প্রমান করা যাইতে পারে। বাস্তবিকপক্ষে, এই সমস্ত পরিবর্তন, প্রতি শতাব্দীতে সূর্যের ০.৭৫ সেকেন্ড পরিমাণ চাপ এবং চাঁদের অবস্থান ৫.৮ সেকেন্ড পরিমাণ চাপ আগাইয়া দেয়। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে ইহাদের মান পাওয়া যায় ১.৫ ± ০.৩ এবং ৪.৫ ± ০.৭; এই পরিমাণের সঙ্গে গণনা দ্বারা প্রাপ্ত পরিমাণের যুক্তিসঙ্গত মিল আছে। অতএব পৃথিবী ও চাঁদের কোন ভিতরের দূরত্বের গণনা দ্বারা প্রাপ্ত বৃদ্ধির নির্ভূলতা সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
গাণিতিক হিসাব দ্বারা জর্জ ডারউইন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন যে প্রায় x১০ বৎসর পূর্বে চাঁদ প্রকৃতই পৃথিবীর সঙস্পর্শে ছিল। এই সমস্ত গণনার একটি আশ্চর্য ফল এই যে সেই সময়ে মাসের দৈর্ঘ্য (চাঁদের কক্ষপরিভ্রমনকাল) এবং দিনের দৈর্ঘ্য (পৃথিবীর আহ্নিক আবর্তনকাল) সমান ছিল এবং উভয় দৈর্ঘই বর্তমান দিনের ৭ ঘন্টার সমান ছিল।
সেই আদিম যুগে, সূর্যের বেলোর্মি আকর্ষণে জননীদেহের যে স্থান হইতে চাঁদ জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, পৃথিবী পৃষ্ঠের ঠিক সেই স্থানের উপরেই সে স্থির হইয়া ছিল। আমাদের উপগ্রহের এই বাল্যকালকে আমরা সঙ্গতভাবে হাওয়াইয়ান চাঁদ বলিতে পারি, কেননা, যতদূর সম্ভব প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যস্থলই ছিল চাদেঁর জন্মস্থান। প্রশান্ত মহাসাগরের জঠর যে মাতা-বসুন্ধরার কঠিন ত্বকে একটি বিরাট ক্ষত ছাড়া আর কিছুই নয়, এবং ইহা যে তাহার প্রথমা ও একমাত্র কন্যার জন্মকথা সর্বদা মনে করাইয়া দেয়, এরূপ অনুমান করিবার সপক্ষে যথেষ্ট প্রমান আছে।

সূর্য ও অন্যান্য তারার বয়স
কিন্তু সূর্য ও অন্যান্য তারাসমূহের ব্যাপার কি? তাহাদের বয়স কত? যে তেজ তারাসমূহকে উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল রাখে তাহার উৎস অনুসন্ধান করিলে, আমাদের সূর্য যে বিরাট তারা-পরিবারের নগণ্য একজন সদস্য মাত্র, সেই ছায়াপথের বয়স আমরা গনণা করিতে পারি। ইহা একটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য যে তারাদের ভিতরের মূল হাইড্রোজেন সমষ্টি ক্রমাগত হিলিয়ামে রূপান্তরিত হওয়ার ফলেই তাহাদের ভিতরের তেজ উৎপন্ন হয়। (পঞ্চম অধ্যায়ে এ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে।) হাইড্রোজেন কেন্দ্রকণীয় রূপান্তরে হিলিয়ামে পরিণত হইলে,


… অন্তর্ভূক্তি চলছে


THE CREATION OF THE UNIVERSE - George Gamow; অনুবাদ - মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
(পাতাটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet