রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

“বিদেশ থেকে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যেসকল পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।”

হার্ভার্ড কলেজের মানমন্দিরের পরিচালক বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হ্যারলো শ্যাপলি ১৯৫০ সালে এরকম আন্তরিক ভাষায় একটি চিঠি পাঠান যশোর জেলার কালেক্টরেট অফিসের একজন সামান্য কেরানীকে। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ শিক্ষা না থাকা সত্বেও পৃথিবী বিখ্যাত সব মানুষদের সাথে তার সংযোগ ঘটেছিল, এই চিঠিটি তারই প্রমাণ। মানুষটি ছিলেন রাধাগোবিন্দ চন্দ্র, ভারত উপমহাদেশের সফলতম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একজন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী হ্যারলো শ্যাপলি ১৯৫০ সালে  চিঠিটি পাঠান যশোর জেলার কালেক্টরেট অফিসের রাধাগোবিন্দ চন্দ্রকে
রাধাগোবিন্দ ১৮৭৮ সালের জুলাই ১৬ তারিখে বর্তমান বাংলাদেশের যশোর সদর উপজেলার বকচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা গোরাচাঁদ স্থানীয় একজন ডাক্তারের সহকারী ছিলেন, আর মা পদ্মামুখ ছিলেন একজন গৃহিণী। বকচর পাঠশালায় অধ্যয়ন শেষে রাধাগোবিন্দ যশোর জিলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তার তেমন আগ্রহ ছিলনা, বরং রাতের আকাশের প্রতি আকর্ষন ছিল বেশি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে তার পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে অক্ষয় কুমার দত্তের লেখা চারুপাঠ বইতে ‘ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড!’ প্রবন্ধটি তাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। এ প্রবন্ধ থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে ওঠে। তার নিজের ভাষায়:

“অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।”

পড়াশোনায় অমনোযোগের কারণে তিন বার প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ১৮৯৯ সালে তার বয়স যখন মাত্র ২১ বছর তখন তার সাথে মুর্শিদাবাদের গোবিন্দ মোহিনীর বিয়ে হয়। তখন মোহিনীর বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। বিয়ের পর রাধাগোবিন্দ শেষবারের মত প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেন এবং এবারও অকৃতকার্য হন। বারবার অকৃতকার্য হয়ে তিনি পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯০০ সালের দিকে ২২ বৎসর বয়সে যশোহর কালেক্টরেট অফিসের ১৫ টাকা বেতনের সামান্য কেরানির চাকরি গ্রহণ করেন। এ থেকে পরে তিনি ট্রেজারি ক্লার্ক ও কোষাধ্যক্ষের পদে প্রমোশন পান। অবসর নেবার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১৭৫ টাকা।

মূলত চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়ার মতো কোন শিক্ষক তাঁর ছিল না। পরে তিনি যশোরের আইনজীবী কালীনাথ মুখার্জীর কাছ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রাথমিক পাঠ নেন।

কালীনাথ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর কিছু প্রাথমিক বই লিখেছিলেন যা ছিল সেই সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি রাধাগোবিন্দকে আকাশ দেখার কাজে তার নিজের নক্ষত্র মানচিত্রটি দিয়ে দেন। রাধাগোবিন্দ চাকরির কাজ শেষে সন্ধ্যে হলেই ছাদে উঠে মানচিত্র কাজে লাগিয়ে চেনার চেষ্টা করতেন নক্ষত্রগুলোকে। কখনো কখনো সফল হতেন আবার কখনো হতেন না। এভাবে খালি চোখেই আকাশ দেখে নক্ষত্র চেনা শুরু করেছিলেন তিনি।

১৯১০ সালে হ্যালির ধূমকেতু আকাশে আবির্ভূত হয়। প্রথমে খালি চোখে ও পরে একটি বাইনোকুলার দিয়ে রাধাগোবিন্দ তার পর্যবেক্ষণ লিখে রাখলেন। পরে এই নিয়ে লিখলেন একাধিক প্রবন্ধ। তার একই প্রবন্ধ হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সে সময় ধীরে ধীরে রাধাগোবিন্দ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় ছোট ছোট প্রবন্ধ পাঠাতে থাকেন। তার সেসব লেখা শান্তিনিকেতনের বিজ্ঞান শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের চোখে পড়লে তিনি রাধাগোবিন্দের কাছে প্রশংসাসূচক চিঠি লিখেন এবং তাকে একটি ভালো মানের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনতে পরামর্শ দিলেন।

১৯১২ সালের দিকে রাধাগোবিন্দ তাঁর বেতনের টাকা ও খানিকটা জমি বিক্রির টাকা দিয়ে একটি দুরবিন সংগ্রহ করেন। এটি ৩ ইঞ্চি ব্যাসের একটি প্রতিসরণ দুরবিন ছিল। ১৯১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুরবিনটি ইংল্যান্ডের F. Bernard থেকে মেসার্স কক্স সিপিং এজেন্সি লিমিটেড এর মাধ্যমে রাগাগোবিন্দের কাছে আসে। রাধাগোবিন্দকে খুব হিসেব করে চলতে হত। সাংসারিক খরচের দ্বায়িত্ব থেকে আকাশ চর্চায় যা ব্যয় হত তা তিনি লিখে রাখতেন। সম্পূর্ণ দুরবিনটি দাম পড়েছিল ১৬০টাকা ১০ আনা ৬ পাই। এই হিসেবটি তাঁর খাতায় লেখা ছিল। প্রথমে মূল দুরবিনটির টিউব ছিল কার্ডবোর্ডের তৈরি। পরে তিনি আরও ৯৬ টাকা ১০ আনা খরচ করে ইংল্যান্ডের মেসার্স ব্রহহার্স্ট এণ্ড ক্লার্কসন থেকে পিতলের টিউব আনিয়ে নেন এবং দুরবিনটির উন্নতি সাধন করেন। রাধাগোবিন্দের নথিপত্রে তাঁর নিজের হাতের লেখায় তিনি লিখে গেছেন:

“সন ১৩১৯ সালের আশ্বিন মাসে দুরবিন আসার পরে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের নক্ষত্রবিদ্যা অনুশীলনের ৪র্থ পর্ব আরম্ভ। এই সময়ে তিনি কালীনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভগোলচিত্রম’ ও ‘তারা’ পুস্তকের সাহায্যে এটা-ওটা করিয়া যুগল নক্ষত্র, নক্ষত্র-পুঞ্চ নীহারিকা, শনি, মঙ্গল প্রভৃতি গ্রহ দেখিতেন। পরে জগদানন্দ রায়ের উপদেশ মত স্টার অ্যাটলাস এবং ওয়েব’স সিলেসিয়াল অবজেক্ট ক্রয় করিয়া যথারীতি গগন পর্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করেন। কিন্তু ইহাতেও তাঁহার কার্য্য বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই। তবে তিনি এই সময়ে গগনের সমস্তরাশি নক্ষত্র ও যাবতীয় তারা চিনিয়া লইয়াছিলেন এবং কোন নির্দিষ্ট তারায় দুরবিন স্থাপনা করিতে পারিতেন।”

রাধাগোবিন্দ ১৯১৮ সালের জুন ৭ আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র দেখতে পেলেন যা তার নক্ষত্রের মানচিত্রে ছিল না। তিনি তার এই পর্যবেক্ষণের কথা হাভার্ড মানমন্দিরে জানান এবং এভাবেই নোভা অ্যাকুইলা-৩ ১৯১৮ আবিস্কৃত হয়। পরে তাকে আমেরিকান এসোসিয়েসন অফ ভেরিয়েবল স্টার অবজারভার (’American Association of Variable Star Observers’(AAVSO)) সম্মানসূচক সদস্যপদ প্রদান করে। ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ এর মধ্যে তিনি ৩৭২১৫টি পরিবর্তনশীল নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন এবং এসব তথ্য আভসো (AAVSO)কে প্রদান করেন। তার এওই কার্যক্রমের জন্য তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত আভসোর এক তালিকাভুক্ত হন, যাতে আরও ২৫ জন জ্যোতির্বিজ্ঞানী যারা ১০,০০০ বেশি পরিবর্তনশীল তারা দেখেছেন।

১৯২৬ সালে চার্লস এলমার এভসো থেকে তাকে একটি ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ উপহার দেন
এরপর আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার এর সদস্য করে নেয়া হয় তাকে। ১৯২৬ সালে চার্লস এলমার এভসো থেকে তাকে একটি ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ উপহার দেন। এরপরে ফরাসি সরকার ভ্যারিয়েবল স্টারের উপর তার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে, ১৯২৮ সালে তাকে OARF (Officers Academic republican francaise)সম্মানসূচক উপাধি ও পদক প্রদান করেন। কলকাতায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মারফত তাকে এ সম্মান জানানো হয়। এর আগে কোনো বাঙ্গালি ফ্রান্স সরকারের এমন সম্মান অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেননি। তাকে সদস্য করে নেয়া হয় Association francaise des Observateurs d’etoiles Variables (AFOEV) এবং ব্রিটিশ এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনে।

বাংলাদেশে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটালেও ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পরে পাকিস্তান ও ভারত সৃষ্টির কিছুকাল পর তিনি ভারতে চলে যান। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে তিনি ১৯৬০সালে ভারতে যান। এসময় তিনি অবসর জীবনযাপন করছিলেন। যশোরের তৎকালীন জেলা কমিশনার এম.আর. কুদ্দুস সহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তারা তাকে ভারতে চলে যেতে বলেছিলেন। মার্কিন সরকার তাকে একটি দূরবীন উপহার দিয়েছিলো। এছাড়া তিনিও জমি বিক্রি করে একটি দূরবীন কিনেছিলেন। ভারতে যাবার সময় তিনি দূরবীন নিয়ে যান। কিন্তু বেনাপোল বন্দরে কাস্টম্স তার দূরবীন জবরদস্ত করে। এরপর ভারতে যেয়ে তিনি আমেরিকা ও ফ্রান্স সরকারের সাথে যোগাযোগ করেন। পরে যশোরের জেলা প্রশাসক নিজে গিয়ে তার বাড়িতে টেলিস্কোপটি তাকে ফেরত দিয়ে আসেন।

ভারতে যাওয়ার পর তিনি যথেষ্ট আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার প্রায় সমস্ত বইপত্র এবং তিন ইঞ্চির সেই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তিনি দান করে দিয়ে যান বারাসাতের সত্যভারতী বিদ্যাপীঠে। এলমারের দেওয়া টেলিস্কোপটি তার মৃত্যুর পরে দক্ষিণ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ভেইনু বাপ্পুর কাছে কিছুদিন থাকার পর এখন পরম যত্নে রাখা আছে দক্ষিণ ভারতের কাভালুর মানমন্দিরে।

তথ্যসূত্র:

- উইকিপিডিয়া
- roar.media
- সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; দ্বিতীয় সংস্করণ
- বাংলা সাহিত্যের কথা, সুকুমার সেন। সপ্তম সংস্করণ
- Monthly Reports and Annual Reports of the American Association of Variable Star Observers, p. 133 (1926)
- বিজ্ঞান সাধক রাধাগোবিন্দ, অমলেন্দু বন্দোপাধ্যায়
- তিন অবহেলিত জ্যোতিষ্ক- রণতোষ চক্রবর্তী


রাধাগোবিন্দ চন্দ্র
(পাতাটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet