মোহাম্মদ আবদুল জব্বার

মোহাম্মদ আবদুল জব্বার: বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূতমোহাম্মদ আবদুল জব্বার: বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত। জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আমাদের দেশে জনপ্রিয় করার পথিকৃত ছিলেন মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে তার এই সাহসিকতাময় ভূমিকা এবং অবদান আজো প্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে আমাদের .. ..

মোহাম্মদ আবদুল জব্বার: বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূতজ্যোতির্বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অগ্রদূত মোহাম্মদ আবদুল জব্বার এর জন্ম ১৯১৫ সালে পাবনার সুজানগর থানার গোপালপুর গ্রামে। অসাধারণ মেধাশক্তি ও প্রতিভার জন্য প্রাইমারী থেকে এমএসসি পর্যন্ত বৃত্তি পেয়েছেন। ১৯৩৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। এমএসসিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৩৯ সালে বিলেত যান। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের কারণে এক বছর পর তাঁকে ভারত সরকারের নির্দেশে দেশে ফিরে আসতে হয়।
তিনি ১৯৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে প্রভাষক পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজে যোগদান করেন এবং সেখান থেকে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ। দেশ বিভাগের পরপরই তিনি চলে আসেন তার নতুন কর্মক্ষেত্র রাজশাহী কলেজে। অতঃপর ১৯৪৮ সালে গণিতের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, ঢাকায় যোগদান করেন। এখানে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি একটানা প্রায় পনের বছর ছিলেন। ১৯৬২ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ উন্নীত হয় পূর্ব পাকিস্থান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিষ্ট্রার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এম. রশীদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ডঃ রশীদ ফাউন্ডেশন। আপন প্রতিভা ও যোগ্যতা বলে অধ্যাপক জব্বার ‘ডঃ রশীদ অধ্যাপক’ পদে নিযুক্ত হন।
রাজশাহী কলেজে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ানোর দায়িত্ব প্রাপ্তির পর তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী হন। তখন রাজশাহী কলেজে ৬ ইঞ্চি ব্যাসের একটি দুরবিন ছিল। এই দুরবিনের সাহায্যে তিনি শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল জব্বারকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য তৎকালীন বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান জনাব এনামুল হক এবং কাজী মোতাহার হোসেন যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দেন।
আবদুল জব্বারের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও পরিকল্পনায় নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সিলেসশিয়াল গ্লোব বা খ-গোলক। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনে রক্ষিত এই খ- গোলকটি (আকাশ সম্বন্ধীয় গোলক) জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ৪৫ ইম্ফি ব্যাসের এই গোলকটিতে সর্বমোট ১ হাজার ৯শ’ ৯০টি তারার অবস্থান দেখানো হয়েছে। এছাড়া এতে রয়েছে ৮৮টি তারামন্ডলের সরল রৈখিক চিত্র, পিকটেরিয়াল চিত্র।
অধ্যাপক আবদুল জব্বার ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি ও আজীবন সদস্য। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ্যা সংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুল জব্বার জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা। এই বিশেষ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে তিনি একক কৃতিত্বের দাবিদার। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: বিশ্ব রহস্যে নিউটন ও আইনস্টাইন (১৯৪২), খ-গোল পরিচয় (১৯৬৪), তারা পরিচিতি (১৯৬৭), প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান (১৯৭৩), বিশ্ব ও সৌরজগৎ (১৯৮৬), আকাশ পট (১৯৮৯)। গণিত বিষয়ে তিনি কয়েকটি পাঠ্যপুস্তকও লিখেছেন, যেমন-টেক্সটবুক অব ইন্টারমিডিয়েট ক্যালকুলাস, টৈক্সটবুক অব ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস প্রভৃতি। এসব গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
নিজের মেধা ও কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অধ্যাপক আবদুল জব্বার বিভিন্ন পদক ও পুরষ্কার লাভ করেছেন। বিজ্ঞান সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি ডঃ কুদরত-ই-খুদা স্মৃতিপদক (১৯৮০), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার (১৯৮৩), একুশে পদক (১৯৮৫) এবং খেলাঘর আসর, অনুসন্ধিৎসু চক্র ও বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে দেয়া ‘ব্রুণো পদক’ (১৯৯০)- এ ভূষিত হন।
খ্যাতিমান এই জ্যোতির্বিজ্ঞানী ১৯৯৩ সালের ২০ জুলাই তারিখে মৃত্যুবরণ করেন।

 


মোহাম্মদ আবদুল জব্বার
(পাতাটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet