প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ

প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ : ভারতীয় রাশিবিজ্ঞানের জনকপ্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ : ভারতীয় রাশিবিজ্ঞানের জনক।পরিসংখ্যানভিত্তিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে দারিদ্র দূর করা, বন্যা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ জীবনকে সুন্দর করে তোলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
আধুনিক ভারতীয় রাশিবিজ্ঞানের জনক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ ১৮৯৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার বিখ্যাত মহলানবিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বিক্রমপুরে পঞ্চসার গ্রামে ছিল মহলানবিশ পরিবারের আদি নিবাস। প্রশান্তচন্দ্রের পিতামহ গুরুচরণ মহলানবিশ এবং আরো কয়েকজন আলোকিত মানুষ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ। যে প্রতিষ্ঠান তৎকালীন বাংলায়, সমাজের প্রতিটি স্তরে নবজাগরণের মশাল প্রজ্জ্বলন করেছিল। তাঁর পিতা ছিলেন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী প্রবোদচন্দ্র মহলানবিশ ও মাতা নিরদবাসিনী।
প্রশান্তচনন্দ্রের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ব্রাক্ষ্ম বয়েজ স্কুলে। এখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে কলেজ জীবন শুরু করেন বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। এই কলেজ থেকে আইএসসি এবং পদার্থবিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১৩ সালে ইউরোপ পাড়ি দেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত এবং পদার্থবিদ্যায় ট্রাইপোস সহ প্রথম শ্রেণীর কৃতিত্ব অর্জন করেন।
বস্তুত কেমব্রিজের কর্মমুখর দিনগুলিই তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভা বিকাশের পথ সুগম করে দেয়। পদার্থবিদ্যার ছাত্র হয়েও তিনি রাশিবিজ্ঞান সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহী হন। কেমব্রিজে থাকাকালীন অধ্যাপক ম্যাকলে প্রশান্তচন্দ্রকে একটি বায়োমেট্রিকা পড়তে দেন। শিক্ষক ম্যাকলেই রাশিবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রশান্তচন্দ্রের সর্বপ্রথম গ্রন্থিবন্ধন করিয়ে দেন। এই সময় প্রশান্তচন্দ্র ডিকিনশান, হার্ডি, রামানুজনের মত বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিবিড় সাহচর্য লাভ করেন।
দেশে ফিরে প্রশান্তচন্দ্র প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ঐ বিভাগের প্রধানের পদ (১৯২২-৪৫) ও অধ্যক্ষের পদ (১৯৪৫-৪৮) অলঙ্কৃত করেন। অধ্যাপনাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। অধ্যাপনার সঙ্গে সঙ্গে রাশিবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণায়ও মনোনিবেশ করেন।
প্রশান্তচন্দ্র খুব অল্প বয়সেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের কন্যা নির্মলকুমারীকে প্রশান্তচন্দ্র বিয়ে করেন। এই বিয়ে উৎসবে রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বকবির সাহচর্য, প্রেরণা, পরিসংখ্যান সংক্রান্ত কাজকর্মে উৎসাহ, প্রশান্তচন্দ্রের জীবনে আশীর্বাদের মত বর্ষিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের রচনা সংরক্ষণ, প্রকাশ, প্রচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রশান্তচন্দ্রের ভূমিকা ছিল। রবীন্দ্র সাহিত্যের সমালোচক হিসেবেও প্রশান্তচন্দ্র স্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্য ‘বনফুল’ সম্পর্কে প্রশান্তচন্দ্রের মূল্যায়ণ বিশিষ্ট সমালোচক ও রবীন্দ্রজীবনীকারেরাও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন। প্রশান্তচন্দ্র লিখেছেন - ‘বিশ্বপ্রৃকতির সহিত মানুষের নিগূঢ় সম্পর্ক আছে - এটি যেমন কালিদাসের মূল সুর, তেমনি রবীন্দ্র সাহিত্যেরও একটি মূল সুর। বালককালের লেখার মধ্যেও এই সুর বাজিয়াছে এবং এখনও সেই সুর বাজিতেছে। বিশ্বপ্রকৃতরি সহিত মানব মনের মিলন যেখানে পরিপূর্ণতা লাভ করে নাই সেখানেই বিরোধ সেখানেই দ্বন্দ্ব। মানুষের সুখ-দুঃখের পেছনে যে একটি বিশ্বপ্রকৃতি স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছে, বনফুলের গল্পের ফাঁকে ফাঁকে আমরা তাহার আভাস পাই।’
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতবর্ষে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিবিজ্ঞান সংক্রান্ত পড়াশুনা বা গবেষণার সুযোগ ছিল না। বিশ্বের পুরসংখ্যানের ক্ষেত্রে ভারতীয়রা যে অগ্রগণ্য তার মূলে রয়েছে প্রশান্তচন্দ্রের উদ্যোগ ও অনুপ্রেরণা। ১৯৩২ সালে প্রশান্তচন্দ্রের রাশিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডল সম্পর্কে দুটি মৌলিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ভারতীয় ছাত্রদের রাশিবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সুবিধার জন্য প্রশান্তচন্দ্র ১৯৩১ সালে তাঁর জীবনের অক্ষয় কীর্তি ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করেন। নৃবিজ্ঞানে রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ করে তিনি ‘মহলানবিশ ডিস্ট্যান্স’ নামে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। উত্তরবঙ্গ ও উড়িষ্যার বন্যা, পৃথিবীর আবহাওয়া, নদী-পরিকল্পনা প্রভৃতি প্রশান্তচন্দ্রের গবেষণায় স্থান পায়। পরিসংখ্যানভিত্তিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে দারিদ্র দূর করা, বন্যা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ জীবনকে সুন্দর করে তোলাই ছিল তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য।
১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রাশিবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়। প্রশান্তচন্দ্র এই বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন। ঐ বছরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাঠের ব্যবস্থা হয়। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বাংলা সরকারের রাশিবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে বাংলায় প্রথম স্ট্যাটিসটিক্যাল ব্যুরো স্থাপিত হয়। এরপর ১২টি প্রদেশে এই ব্যুরো গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে রাশিবিজ্ঞানকে একক শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রশান্তচন্দ্র ১৯৪৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ভারত সরকারের উপদেষ্টা ও প্লানিং কমিশনের দস্য নিযুক্ত ছিলেন। স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটকে বাদ দিয়ে প্রশান্তচন্দ্রের কথা চিন্তা করাযায় না। তিনিই ছিলেন এর প্রাণপুরুষ। বিভিন্ন সময়ে বহু বিশ্বনন্দিত বৈজ্ঞানিক এই প্রতিষ্ঠানে আসেন।
১৯৫৪ সালে প্রশান্তচন্দ্র লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটির অবৈতনিক সদস্য পদে নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ঐ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ভারত সরকারের সর্বোচ্চপদক পদ্মবিভূষণ লাভ করেন ১৯৬৮ সালে।
প্রশান্তচন্দ্রের সাহিত্য প্রীতি সর্বজনবিদিত। সংখ্যা নামে পরিসংখ্যান বিষয়ক একটি পত্রিকাও তিনি প্রকাশ করেন। প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের মধ্যে বিজ্ঞান সাধনায় সহযোগিতার সেতু রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। ভারতবর্ষে রাশিবিজ্ঞানের প্রসার, গবেষণা ও চর্চায় তাঁর অবদান অসামান্য। বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রশান্তচন্দ্রের জীবনে সৌজন্যবোধ, মানবপ্রীতি প্রভৃতি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। ১৯৭২ সালের ২৮ জুন প্রশান্তচন্দ্র মৃত্যুবরণ করেন।


প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ
(পাতাটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet