নিকোলাস কোপার্নিকাস: তাঁর জীবন ও কর্ম - রবীন্দ্রনাথ রায়

জ্ঞানবান মানুষেরা স্বভাবতই খ্যাতিমান হন, খ্যাতির শিখরে আরোহণ করেন। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই হোক,সুদূর প্রাচীন কালেই হোক,কিংবা হোক আধুনিককালেই - সকল যুগে সর্বকালে এ এক অবিসংবাদিত সত্য। এর কারণ, জ্ঞান মানুষকে দেয় শক্তি, তাকে এগিয়ে নেয় সম্মুখপানে। আর অজ্ঞনতা, কুপমন্ডুকতা মানুষকে করে দেয় দূর্বল ও অসহায়। সবসময় তাকে টেনে নেয় পেছন দিকে, ডেকে আনে তার জন্য চরম দুর্ভাগ্য আর পরাজয়। কিন্তু ইতিহাস জানিয়ে দেয়: এসব দুর্ভাগ্য আর পরাজয় চিরন্তন নয়, নয় অনড়, অটল, অমোচনীয় কোনকিছু। এর শেষ আছে, অবশ্যই আছে অবসান। শেষ পর্যন্ত জ্ঞানের কাছে অজ্ঞানতার পরাজয় হয়ে ওঠে অনিবার্য। আলোকে পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অন্ধকার। এভাবেই এগিয়ে চলে মানুষ। জ্ঞানের ভান্ডারে তার প্রতিকণা সঞ্চয় যে আলোকচ্ছটা বিকিরণ করে তাতেই দীপ্ত হয় মানুষের সভ্যতা। সে কারণে জ্ঞানালোকিত মানুষেরা কখনো সখনো তাদের স্বকালে নির্যাতিত হয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরাই হয়েছেন পরম শ্রদ্ধেয়, পরম পূজনীয়, সবার ভালোবাসার পাত্র। দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণের উর্ধ্বে উঠে, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে এঁরা সমাসীন থেকে আসছেন মর্যাদার সুউচ্চ শিখরেও।

আবার প্রতিভাদীপ্ত এসব মহান মানুষদের কোন ভুলও কিন্তু হয়ে দাঁড়াতে পারে মানুষের মুক্তচিন্তা আর জ্ঞানালোকের বিস্তারের পথে এক প্রবল প্রতিবন্ধক। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা উঠলে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়। মহান ব্যক্তিদের দ্বারা লালিত হওয়ার ফলে একটি ভ্রান্ত ধারণা যে হাজার হাজার বছর ধরে বহাল থাকতে পারে তারই এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক ভ্রান্ত ধারণা। মহাশূন্যে প্রথিবী ও তার উপগ্রহ চাঁদ, অপরাপর গ্রহগুলো এবং আমাদের সৌরজগত যে নক্ষত্রকে ঘিরে বিদ্যমান সেই সূর্য ও সূর্যের মত বা তার চেয়ে বহু গুণ বড় সৌরজগতের বাইরের যে অসংখ্য নক্ষত্র তাদের তুলনামূলক অবস্থান ও গতিবিধি নিয়ে আলোচনা করে যে শাস্ত্র তাই জ্যোতির্বিজ্ঞান। জ্যোতিষশাস্ত্র যে বিজ্ঞান হয়ে উঠতে পেরেছে তার কৃতিত্ব কোন একক ব্যক্তির নয়। তবে বিজ্ঞান হিসেবে এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রগণ্য যাঁর অবদান তিনি পোলিশ মনীষী নিকোলাস কোপার্নিকাস।

আদিকালে মানুষ পৃথিবীটাকে সমতল বলেই ভাবত। সাদামাটা দৃষ্টিতে পৃথিবীকে কিন্তু সমতলই মনে হয়। এ ধারণার প্রতিবাদ করেছিলেন প্রাচীনকালের (খ্রি. পূ. ৬ষ্ঠ শতকের) শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ পিথাগোরাস। পিথাগোরীয় ত্রিভূজের কল্যাণে যাঁর কথা আমরা সকলেই জানি সেই পিথাগোরাস বললেন, সাধারণ চোখে পৃথিবীকে সমতল বা থালার মত চ্যাপ্টা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ কিন্তু সমতল নয়, এটা গোলাকার। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। আজকের মত সৌরজাগতিক এক গ্রহ হিসাবে পৃথিবীর কথা তখন কেউ জানত না। সবাই মনে করত পৃথিবীর অবস্থান মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে। অপরাপর যাবতীয় গ্রহ, সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র এই স্থির পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই আবর্তমান। আর এ আবর্তন ঘটে বৃত্তাকার পথে। বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডের কেন্দ্রে পৃথিবীর এই অবস্থানভিত্তিক যে ধারণা তারই অপর নাম ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric) বিশ্ব। অজ্ঞাতকাল থেকে শুরু করে একেবারে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত এ ধারণা বহাল তবিয়তে ছিল। গ্রিক সভ্যতার অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, জ্ঞানের মহান সাধক এরিস্টটলও (খ্রি. পূ. ৪র্থ শতক) পোষণ করতেন একই ধারণা। তাঁর কাছেও পৃথিবী স্থির ও বিশ্ব জগতের কেন্দ্র। এলেন খ্র্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতকের মিশরীয় মহাজ্ঞানী পুরুষ ক্লডিয়াস টলেমি। সুদূর সেই প্রাচীণকালে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ভূগোলশাস্ত্র রচনার ক্ষেত্রে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে যিনি ছিলেন প্রথম উদ্যোক্তা সেই টলেমিও কিনা ছিলেন ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বের তত্ত্বে বিশ্বাসী। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিশ্বের সেরা গ্রন্থ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল যে ‘মেগেল ম্যাথম্যাটিক সাইনট্যাক্সিস’ (Megale Mathematike Syntaxi’s), আরবীয়দের অনুবাদে যার নাম হয়েছিল ‘এ্যালমাজেস্ট’ (Almagest) এবং সমস্ত মধ্যযুগ ধরে যে গ্রন্থ ‘জ্যোতিষশাস্ত্রের বাইবেল’ বলে শ্রদ্ধাকর্ষণ করে চলেছিল তার রচয়িতা টলেমিও বিশ্বব্রক্ষ্মান্ড সম্পর্কে পোষণ করতেন একই ধারণা।

যদিও টলেমিরও কয়েক শতাব্দী আগে ঈজিয়ান অঞ্চলের চিয়স দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যারিস্টারকাস সূর্যকেই বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু বলে গণ্য করেছিলেন, তথাপি টলেমি বা তাঁর অনুসারীরা এ মতবাদ গ্রহণ করেননি। বরং তারা এ মতবাদের বিরোধিতায়েই ছিলেন সোচ্চার। তাঁরা বলতেন, বিশ্বের সকল বস্তু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান। আর এ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হাজারো রকমের নক্সা ও বিশ্ব কাঠামোর মডেল তৈরি করেছিলেন তাঁরা। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে বিশ্বের সবকিছুই যখন তাঁদের মতানুযায়ী ঘূর্ণায়মান তখন ধ্রুবতারাকেও র্ঘর্ণায়মান হতে হবে। কিন্তু তাদের মতবাদের সাথে কোনরূপ সামঞ্জস্য না রেখে ধ্রুবতারা উত্তর আকাশে কেন স্থিরভাবে থেকে যায় তার কোন সদুত্তর দিতে না পারলেও নিজেদের মতবাদে তাঁরা অবিচলই থেকে যান। এরই ফলশ্রুতিতে ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বের এই ভ্রান্ত ধারণাটি মানবমনকে বার’শ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে রাখে। এমনকি এ ধারণা ধর্মবিশ্বাসেরও মর্যাদা লাভ করে বসে। চিয়স দ্বীপের অ্যারিস্টারকাসের মূলগতভাবে সঠিক ধারণাটি তুলে ধরার প্রায় দু সহস্রাব্দ সময়কাল পরে মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসই অধিকতর সুসঙ্গতভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণরত গ্রহসমূহকে নিয়ে যে সৌরজগতের কথা আজ আমরা জানি, এমনকি আজকের স্কুল ছাত্রও যে ধারণার সাথে সুপরিচিত, সেই ধারণাটির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন। অবশ্য এ ধারণা পোষণ করার কোন অবকাশই নেই যে, সঠিক ধারণাটি তুলে ধরা মাত্রই মানুষ তা লুফে নিয়েছিল। বরং জ্ঞান বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রতিটি অগ্রপদক্ষেপকেই যেভাবে শতসহস্র বিঘ্ন অতিক্রম করে, জ্ঞানতাপস মানুষদের বহু বহু আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়, কোপার্নিকাসের মতবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার ব্যাপারেও সেক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু আপাতত সে প্রশ্নে না গিয়ে আমরা বরং তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিয়েই আলোচনায় ব্রতী হব।

নিকোলাস কোপার্নিকাসসকে বলা হয়ে থাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক।কোপার্নিকাসকে বলা হয়ে থাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক। পূর্ব পোল্যান্ডের ভিশ্চুলা নদীর নিকটে তরুন নামক স্থানে ১৪৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা ছিলেন একজন প্রভাবশালী বণিক। বাল্যকালেই তাঁর পিতৃ বিয়োগ ঘটে। ১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে কোপার্নিকাস ক্রাকৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেখানে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গণিতশাস্ত্র ও আলোকবিজ্ঞানও ছিল তাঁর অধ্যয়নের বিষয়। তাঁর অভিভাবক ও মামা এর্মেল্যান্ডের নব নির্বাচিত বিশপ লুকাস ভাকজেনরোড চাইলেন আজীবন আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য ভাগ্নে ফ্রাউয়েনবার্গের গির্জায় যাজকের পদ গ্রহণ করুক। যাজকের পদটি শূণ্য না হওয়া পর্যন্ত সময়কালে যাতে তিনি যাজকের বৃত্তি সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞান লাভ করতে পারেন তার জন্য ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মামা তাঁকে ইতালীর বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। সাড়ে তিন বছর ধরে কোপার্নিকাস গ্রিক ভাষা গণিতশাস্ত্র ও প্লেটোর রচনাবলী অধ্যয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কীয় তৎকালীন চিন্তাভাবনার সাথেও তিনি অধিকতর পরিচিত হয়ে ওঠেন। বোলোনায় থাকাকালেই ১৪৯৭ সালে তাঁর প্রথম মহাকাশ পর্যবেক্ষণের কথা লিপিবদ্ধ হয়। একই বছর তিনি ফ্রাউয়েনবার্গর যাজক নির্বাচিত হন। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পরে এ চাকরী ছেড়ে দিয়ে ফ্রাউয়েনবার্গ গির্জায় প্রধান যাজকের পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৫০১ খ্রিষ্টাব্দে ইতালীর বিখ্যাত পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য তিনি বিশেষ ছুটি নেন। সেখানে তাঁর পাঠের বিষয় ছিল আইনশাস্ত্র ও চিকিৎসাবিজ্ঞান। পাদুয়াতে ছিলেন প্রায় ৪ বছর। এর মাঝে সংক্ষিপ্ত সময় ব্যয় করেন ফেরার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মশাস্ত্রের উপর ডক্টরেট ডিগ্রী নেয়ার জন্য। ইতালীর আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন তিনি।

১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফিরে আসেন পোল্যান্ডে এবং ক্রাকৌ সফর করেন। পরবর্তীতে ১৫১২ খ্রিষ্টাব্দে মামার মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেন। মামার মৃত্যুর পরে হন ফ্রুয়েনবার্গ গির্জার সর্বময় কর্তা। এখানে অভাবী মানুষের কাজে লাগে তাঁর চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান। কথিত আছে যে, ক্রাকৌ, পাদুয়া ও ইতালীর অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের ফলে কোপার্নিকাস তৎকালীন গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানই আয়ত্ব করে ফেলেছিলেন। ফ্রুয়েনবার্গ গির্জায় থাকাকালে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ও এ নিয়ে গবেষণার সুযোগ তাঁর কাছে অবারিত হয়। একাকী ও নিরবে তিনি চালিয়ে যান গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ। এক্ষেত্রে কারও কাছ থেকে সহযোগিতা বা পরামর্শ তিনি পাননি। গির্জার দেওয়ালে একটি উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহরাজির গতিবিধি একেবারে খালি চোখে পর্যবেক্ষণ করতেন। কেননা দূরবীক্ষণ আবিষ্কার হয়েছিল এ সময় থেকে আরও একশ বছর পরে। তাঁর এসব পর্যবেক্ষণের ফলাফল তিনি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারের বইয়ের পৃষ্ঠাতেও এরকম কিছু মন্তব্য লিপিবদ্ধ পাওয়া গেছে। ১৪৯৭ থেকে ১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এরূপ ২৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল।
এসবের পরিণামে জ্যোতির্বিদ্যার একজন পরিশ্রমী ও একজন একনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসাবে কোপার্নিকাসের সুনাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে চার্চ কর্তৃপক্ষের সাধারণ সভা তথা ল্যাটারাল কাউন্সিলে পঞ্জিকা সংস্কারের ব্যাপারে তাঁর অভিমত তুলে ধরার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু প্রচলিত ধারণার যথাযথ পুনর্মূল্যায়নের জন্য চন্দ্র ও সূর্যের অবস্থান পর্যাপ্ত সঠিকতা সহ জ্ঞাত ছিল না বলে অনুভব করে তিনি দৃঢ় কোন অভিমত ব্যক্ত করতে অস্বীকার করলেন।

তাঁর অধ্যয়ন যত এগিয়ে যেতে থাকল ততই তিনি জ্যোতির্বিদ্যা সমপর্কে টলেমিয় ধারণায় বেশী বেশী করে আস্থাহীন হয়ে উঠতে থাকলেন। এই অনাস্থাটা তাঁর একারই ছিল না। বস্তুত তিনি নিজেই বললেন যে, তাঁর সময়কালে এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গীর ক্ষেত্রে যে বহুদা বিভক্তি বিরাজ করত ঠিক তারই কারণে তিনি এ নিয়ে প্রগাঢ় অধ্যয়ন ও সুগভীর চিন্তা-ভাবনা করতেন। কেবল নিজের মৌলিক কাজ নয়, বরং পূর্ববর্তী গ্রিক দার্শনিকগণের দৃষ্টিভঙ্গীগুলোর সংশ্লেষণের মাধ্যমেও গড়ে উঠেছিল যে টলেমিও মডেল, তা ছিল ধারণাগতভাবে ভূ-কেন্দ্রিক ও বৃত্তাকার। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে নভোমন্ডল সম্পর্কে এই পৃথিবী কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা জ্যোতির্বিদ্যায় একেবারে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। বাহ্যিকভাবে বিষয়টা ঠিক পৌঁছে গিয়েছিল ধর্মবিশ্বাসের পর্যায়ে। এমনকি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কোন কোন গ্রিক দার্শনিক যদিও এই অভিমত তুলে ধরেছিলেন যে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেন্দ্র পৃথিবী নয় সূর্য, কিন্তু তাদের এ ধারণা কোন ব্যাপক সমর্থন পায়নি। সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যাদির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রাচীনকালের জ্যোতির্বিদগণ যথেষ্ট সমস্যায় পড়ে গিয়েছিলেন। খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে মুশকিল আসান করলেন ক্লডিয়াস টলেমি। ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বের পূর্ণ ধারণাটি তিনিই হাজির করলেন। বিশাল বিশাল সব বৃত্ত ও তাদের পরিধির উপর পরিভ্রমনশীল সব কেন্দ্র নিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃত্তের সমন্বয়ে গঠিত হল টলেমিয় মডেল। প্রতিটি গ্রহ থাকত ক্ষুদ্র বৃত্তের পরিধির উপর। গ্রহগুলোর উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে তাদের হতবুদ্ধিকর পশ্চাদগতিসহ গ্রহগুলোর গতির অসামঞ্জস্যগুলোর ব্যাখ্যায় টলেমি তাঁর মডেল ব্যবহার করেছিলেন। অধিকন্তু, গ্রহগুলোর বেগের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হ্রাসবৃদ্ধির ব্যাখ্যায় টলেমি শূন্যে বিরাজমান এমন একটা কল্পিত বিন্দুর ধারণা হাজির করলেন যেখানে কোন বস্তু অবিচল গতিতে বৃত্তাকার পতে চলাচল করতে পারে। এই ব্যবস্থাটা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা ও ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণকে সক্ষম করল। কিন্তু এক কথায় টলেমির উদ্ভাবনের মর্মকথা এই ছিল যে, মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থানকারী আমাদের এই পৃথিবী হল একটি স্থির, নিষ্ক্রিয়, গতিহীন বস্তু এবং সূর্য ও তার স্থির সব তারকারাজিসহ সমস্ত জাগতিক বস্তুগুলো এর চারিদিকে ঘূর্ণায়মান। এ ছিল এমন এক তত্ত্ব যা মানব চরিত্রকে নাড়া দিতে পেরেছিল। মানুষের বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ও ভাসাভাসা পর্যবেক্ষণের সাথে এটা হুবুহু মিলে গিয়েছিল। সর্বোপরি এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র বা রাজধানী হিসাবে মানুষের বসতিস্থল এই পৃথিবীটা সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মহাজাগতিক সকল কিছুই একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় বলে ভেবে মানুষের যে অহংবোধ তারই পরিপূরক হয়েছিল টলেমির এ মতবাদ। কিন্তু পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মানুষের পর্যবেক্ষণগুলো যতই অধিক থেকে অধিকতর পরিমানে নিখুঁত হয়ে উঠল ততই মহাশূন্যে বিচরণকারী বস্তুগুলোর ভবিষ্যত অবস্থান নিরূপণ করা বেশি বেশি কঠিন হয়ে পড়তে লাগল। ফলে এ মতবাদের সৌষ্ঠব ও নমনীয়তার অনেকটাই হারিয়ে গেল।

একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ ও প্রগাঢ় পর্যালোচনা করে কোপার্নিকাস এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, জাগতিক বস্তুগুলোর পরিলক্ষিত গতিবিধি ব্যাখ্যার জন্য যেখানে টলেমিয় ব্যবস্থায় অনেকগুলো বৃত্তাকার পথ ও পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে তাদের সরে যাওয়ার এক জটিল ধারণা প্রয়োজন পড়ে এবং তাতে করেও সকল প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেয়া সম্ভব হয় না, সেখানে এ ব্যাপারে একটা অধিকতর সরল, বিকল্প ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া অবশ্যই সম্ভব হতে পারে। অতএব তিনি গভীর অভিনিবেশ সহকারে বহু গ্রিক লেখকের মূল গ্রন্থ পাঠে ব্রতী হলেন এবং দেখতে পেলেন যে, তাতে বাস্তবিকপক্ষে সূর্যকেন্দ্রিক ধারণাকেই তুলে ধরা হয়েছে। চলমান এক পৃথিবীর ধারণা প্রথমে সম্ভব বলে প্রতীয়মান হলেও কোপার্নিকাস যখন এই ধারণা প্রয়োগ করে হিসাব কষলেন তখন খুব একটা সরল না হলেও অধিকতর মনোজ্ঞ এক মডেল তিনি পেয়ে গেলেন। যেমনটা ধারণা করা যেতে পারে, সেভাবে সে সময়ও তিনি কিন্তু বিশ্বাস করতেন যে, গ্রহগুলো স্থির গতিতে বৃত্তীয় পথে পরিভ্রমনশীল। বহু বছরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের পর তিনি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, তাঁর নতুন ধারণা প্রকৃতপক্ষেই সত্য। তথাপি তিনি কিন্তু তা প্রকাশ করার চেষ্টা করলেন না। প্রায় ১৫১০ থেকে ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল ধরে কোপর্নিকাস তাঁর নতুন মতবাদের সংক্ষিপ্তসার হিসাবে De hypothesibus motuum coelestium a syconstitutis commentariolus (মহাশূন্যের বস্তুনিচয়ের বিন্যাস থেকে তাদের গতিশীলতা সম্বন্ধে তত্ত্বসমূহের উপর মন্তব্য) নামে একটি পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তাঁর বন্ধুদের মাঝে প্রচার করেন। গ্রহমন্ডলীয় কেন্দ্রে স্থির অবস্থানে বিদ্যমান সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি ও নিজ অক্ষের চারিদিকে তার আহ্নিক ঘূর্ণন থেকেই যে তারকাগুলোর আপাত প্রতীয়মান দৈনিক গতি, সূর্যের বার্ষিক গতি ও গ্রহসমূহের পশ্চাদগতিশীল আচরণের উদ্ভব ঘটে এ কথাই ছিল ঐ রচনার মূল প্রতিপাদ্য। অতএব পৃথিবী আর মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, বরং কেবল চন্দ্রের কক্ষপথের কেন্দ্র। বছরের পর বছর পেরুতে লাগল, আর নক্সা একেঁ ও গাণিতিক হিসাব করে তিনি তাঁর যুক্তিকে বিকশিত করতে লাগলেন। Commentariolus এ তুলে ধরা নীতিগুলোর ব্যাখ্যা করে ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে রোম পোপ সপ্তম ক্লিমেন্টের সামনে তিনি বক্তৃতাও করলেন এবং তাঁর সমর্থনও লাভ করলেন। প্রকাশ করার জন্য ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও পেলেন কোপার্নিকাস। তা সত্ত্বেও তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন। কেবল তাঁর বন্ধুদের এবং বিশেষ করে তাঁর ও শিষ্য গেওর্গ জোয়াচিম র্যাতটিকাস এর প্রচেষ্টায় তিনি তাঁর রচনা প্রকাশ করলেন। ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে গ্রন্থের সুসম্পন্ন পান্ডুলিপিখানি মুদ্রণের জন্য জার্মানীর নূর্নবার্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হল র্যানটিকাসকে। মার্টিন লুথার, ফিলিপ মেলান্সথন ও অপরাপর সংস্কারকদের বাঁধার কারণে র্যা টিকাস নূর্নবার্গ ত্যাগ করে লিপজিগে গেলেন এবং প্রকাশনার দায়িত্ব আন্দ্রিয়াস ওসিয়ান্ডার এর হাতে তুলে দিলেন। যে আলোচনা এক স্থির সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীকে ঘূর্ণায়মান বলে তুলে ধরে তার ব্যাপারে সমালোচনার ভয়ে ওযসয়ান্ডার নিজ দায়িত্বে গ্রন্থের সাথে একটা মুখবন্ধ জুড়ে দিলেন। মুখবন্ধে এ কথা জোর দিয়ে বলা হলো যে, স্থির সূর্যের প্রকল্পটি ছিল কেবল গ্রহমন্ডলীয় গতিবিধি হিসাব করার এক সুবিধাজনক উপায় মাত্র। যাহোক, পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত De revolutionibus orbium coelestium (জাগতিক গোলকসমূহের ঘূর্ণন সম্পর্কে) নামের এ গ্রন্থ বৈপ্লবিক অবদান রাখল। কথিক আছে, ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ২৪ শে মে ৭০ বছর বয়সে কোপার্নিকাসের মৃত্যুর মাত্র ঘন্টাখানেক আগে তাঁর হাতে এ গ্রন্থের একটি কপি এসে পৌঁছেছিল।

এ গ্রন্থ থেকে প্রতিভাত হয় যে, বিশ্বব্রহ্মান্ডের এক সত্যিকার চিত্র হিসাবে সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বের ধারণায় কোপার্নিকাস সত্যসত্যই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। গাণিতিকভাবে টলেমির ধারণাকে পুনর্ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যেই তিনি ‘ জাগতিক গোলকসমূহের ঘূর্ণন সম্পর্কে’ গ্রন্থখানি রচনা করেছিলেন। যাতে করে পঞ্জিকা সংস্কার ও গ্রহণ সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিতরূপে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হয় এবং একইসাথে যাতে করে বিন্দু ও বৃত্তের একটা সহজ সরল জ্যামিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রহগুলোর উজ্জ্বলতার হ্রাসবৃদ্ধি, পশ্চাদগতি ও বেগের জটিলতা ব্যাখ্যা করা যায় তার জন্য তিনি হিসাব নিকাশের একটা বিকল্প প্রস-াবনা হাজির করা যায় তার জন্য তিনি হিসাব নিকাশের একটা বিকল্প প্রস্তাবনা হাজির করতে চেয়েছিলেন। কোপার্নিকাসের মতবাদ বহু সংখ্যক স্বাধীন চিন্তার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদের অন্তরে সাড়া জাগিয়েছিল। কেবল চমৎকারিত্বের জন্য নয়, বরং অংশতঃ ঐতিহ্যবাহী মতবাদগুলোর অচলায়তন ভেঙ্গে ফেলতে পারার কারণেও এটা মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। নিশ্চল পৃথিবী সম্পর্কে এরিস্টটলের দৃঢ়প্রত্যয়ী যুক্তিধারাকে এ মতবাদ খন্ডন করেছিল। অধিকন্তু ভূ-কেন্দ্রিক টলেমিয় ধারণার অনস্বীকার্য বিকল্প যুগিয়েছিল কোপার্নিকাসের মতবাদ।

পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্যে এই দুই মতবাদ একেবারে ধর্মীয় মতান্ধতার স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল, যদিও চিন্তাশীল বহু পর্যবেক্ষকের কাছে উভয় মতবাদই প্রগতিবিরোধী বলে প্রতিপন্ন হয়েছিল এবং বাতিল হওয়ার অনেক আগেই এগুলো নিশ্বেষিত হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে কোপার্নিকাসের মতবাদ প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গী দুটোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অপরিহার্য করে তুলেছিল। প্রথম পরিবর্তনটা আনা দরকার পড়েছিল মহাবিশ্বের আপাতঃ প্রতীয়মান আকারের ক্ষেত্রে। তারকাগুলোকে স্পষ্টতঃই অভিন্ন স্থির অবস্থানে দেখা যেত; কিন্তু পৃথিবী যদি সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণায়মান হয় তাহলে তারকাগুলোর অবস্থার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র একটা পর্যায়গত পরিবর্তন ঘটা উচিত। কোপার্নিকাস ব্যাখ্যা দিলেন যে, প্রভাদীপ্ত তরকাবৎ গোলকগুলো এত বেশী দূরত্বে অবস্থান করে যে, অবস্থানের এই পরিবর্তনটাকে ধরাই যায় না। এভাবে কোপার্নিকাসের তত্ত্ব জগতের বিস্তার সম্পর্কে পূর্ববর্তী ধারণার গন্ডি অতিক্রম করে অনেক অনেক বেশি বিস্তৃত এক মহাবিশ্বে বিশ্বাস জন্মাল। আর যে ইংল্যান্ডে কোপার্নিকাসের মতবাদকে প্রকাশ্যেই সোৎসাহে গ্রহণ করা হয়েছিল সেখানে সৃষ্টি হল মহাশূন্যে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা তারকারাজিকে নিয়ে এক অনন্ত ব্রহ্মান্ডের ধারণা। দ্বিতীয় পরিবর্তনটা ছিল বস্তুর মাটিতে পড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট। এরিস্টটল শিখিয়েছিলেন যে, জগতের কেন্দ্রে পৃথিবীর অবস্থানের কারণে বস্তুগুলো তাদের স্বাভাবিক স্থানেই পতিত হয়। কিন্তু সূর্য কেন্দ্রিক বিশ্ব সংক্রান্ত মতবাদ অনুসারে পৃথিবী আর মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান না করায় ব্যাপারটার নতুন এক ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েছিল। পড়ন্ত বস্তু সংক্রান্ত এই বিধানগুলোর পুনঃপরীক্ষা পরিণামে অভিকর্ষ সম্পর্কীয় নিউটনীয় মতবাদের অভ্যুদয় ঘটালো।

কোপার্নিকাসের মতবাদ মানুষের ভাবজগতে কেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তা তিনি দেখে যেতে পারেননি। জাগতিক গোলকসমূহের গতি সম্পর্কে তাঁর মহান গ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু মধ্যযুগের মানুষ যেসব দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী ও ধর্মীয় বিশ্বাস পোষণ করত সরাসরি তার বিরুদ্ধেই চলে গিয়েছিল কোপার্নিকাসের মতবাদ। এ বিশ্বাস লালন করা হত (এবং কেউ কেউ এখনও লালন করে) যে, ঈশ্বর তাঁর নিজ আদলেই মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন, ঈশ্বরের পরেই মানুষের স্থান এবং সেকারণে সে সকল সৃষ্টির সেরা, সেরা বিষেশতঃ তার শ্রেষ্ঠ অংশ, তার আত্মার দিক থেকে; আর বাস-বিকপক্ষে মানুষের অসি-ত্বের এই শ্রেষ্ঠ অংশ তথা তার আত্মা এমনকি প্রকৃতি জগতেরও অংশ নয়। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব কিন্তু মানুষকে এ কথা ভাবতে বাধ্য করে যে, মানুষ কেবলমাত্র প্রকৃতিরই অংশ, তার থেকে শ্রেষ্ঠতর কিছু নয়। আর তাই এ তত্ত্ব সেকালের রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী গির্জাধ্যক্ষদের তত্ত্বের বিরুদ্ধেই চলে গিয়েছিল।

কোপার্নিকাসকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন জিওর্দানো ব্রুনো এবং তিনি বলেছিলেন, মহাশূন্যের কোন সীমা পরিসীমা নেই, তা অসীম, আর সূর্য ও তার গ্রহগুলো একদম অসংখ্য ব্যবস্থার মাঝে একটি ব্যবস্থা মাত্র। ব্রুনোর এ ধর্মদ্রোহীতার জন্য ইনক্যুইজিশনের সামনে তাঁর বিচার হল, তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল এবং ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তাকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ফেলে পুড়িয়ে মারা হয়।তৎকালে অপর দু’জন ইতালীয় বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে নিঃসংশয়ে আকড়ে ধরেছিলেন বলে শক্তিশালী গির্জার ইনক্যুইজিটরদের হাতে তাঁদেরকে কঠোর নিগ্রহ বরণ করতে হয়েছিল। এ দুই বিজ্ঞানী হলেন জিওর্দানো ব্রুনো (১৫৪৮ - ১৬০০) ও গ্যালিলিও গ্যালিলি (১৫৬৪ - ১৬৪২)। কোপার্নিকাসকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন জিওর্দানো ব্রুনো এবং তিনি বীরের মত বলেছিলেন, মহাশূন্যের কোন সীমা পরিসীমা নেই, তা অসীম, আর সূর্য ও তার গ্রহগুলো একদম অসংখ্য ব্যবস্থার মাঝে একটি ব্যবস্থা মাত্র। আর যদি তাই হয় তাহলে আমাদেরই মত বা সম্ভবতঃ আমাদের থেকেও অধিকতর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন স্বত্ত্বাদের আবাসস্থল হিসাবে আরও অনেক জগতের অস্তিত্ব থাকাও অসম্ভব নয়। এ ছিল ঘোর ধর্মবিদ্বেষী কথা। কেননা ধর্মীয় মত অনুসারে মানুষই সৃষ্টির সেরা এবং তার থেকে শ্রেষ্ঠ কোন প্রাণী ও তাদের আবাস হিসাবে অপর কোন দুনিয়ার অস্তিত্ব একেবারেই অসম্ভব। অতএব ব্রুনোর এ ধর্মদ্রোহীতার জন্য ইনক্যুইজিশনের সামনে তাঁর বিচার হল, তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হল এবং ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তাকে ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ে ফেলে পুড়িয়ে মারা হল। গ্যালিলিওকে ধরা হল ১৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে, যখন তাঁর বয়স ৬৭ বছর। সেখানে এই মহান বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাপস বৃদ্ধকে তাঁর চেয়ে ‘শ্রেষ্ঠরা’ নির্যাতন ও মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অবনত মস্তকে কোপার্নিকাসের তত্ত্বে তাঁর সকল আস্থা অস্বীকার করতে বাধ্য করল এবং তারপরে জীবনের বাকি ৯টি বছরের জন্য তাঁকে কারারুদ্ধ করে রাখল।

মহান বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাপস গ্যালিলিওকে তাঁর চেয়ে ‘শ্রেষ্ঠরা’ নির্যাতন ও মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে অবনত মস্তকে কোপার্নিকাসের তত্ত্বে তাঁর সকল আস্থা অস্বীকার করতে বাধ্য করায় এবং তারপরে জীবনের বাকি ৯টি বছরের জন্য তাঁকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।বিশ্বব্রহ্মান্ডের ক্রেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে পৃথিবীর সিংহাসনচ্যুতি সৃষ্টি করেছিল প্রচন্ড এক আকস্মিক আঘাত। অন্যান্য গ্রহগুলোর মত একটা গ্রহমাত্রে পর্যবসিত হওয়ার কারণে পৃথিবীকে আর সৃষ্টির আদি বলে গণ্য করা গেল না। ঘিরে থাকা পরিবর্তনহীন ব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রে সকল পরিবর্তন ও বিনাশের উৎস হিসাবে পৃথিবী আর পরিগণিত হতে পারল না। নিজেকে ঘিরে থাকা বিশাল স্বত্ত্বা বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রতিফলক হিসাবে ক্ষুদ্র স্বত্ত্বা মানুষের সাথে তাকে সবসময়ই তাল মিলিয়ে চলতে হয় বলে যে ধারণা তা তার সকল মর্যাদা হারাল। প্রাচীন কর্তৃত্বের পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সফল চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য দরকার ছিল মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের দার্শনিক ধারণার ক্ষেত্রে এক পরিপূর্ণ পরিবর্তন আনয়নের। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব এনে দিল সেই পরিবর্তন, যাকে তার যথার্থই “কোপার্নিসীয় বিপ্লব” বলে অভিহিত করা যায়। মহান জার্মান কবি গ্যেটের ভাষায় বলা যায়:
‘সকল আবিষ্কার ও অভিমতের মধ্যে আর কোনটাই মানব মনের উপরে ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি, যতটা ফেলেছিল কোপার্নিকাসের মতবাদ। বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রে অবস্থান করার বিশাল সুবিধাটা ঝেড়ে ফেলার দাবী যে সময়ে উঠল তখন পর্যন্তও কিন্তু গোলাকৃতি ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসাবে পৃথিবী খুব একটা পরিচিতি লাভ করেনি। মানবজাতির কাছে এতবড় দাবী এর আগে কেউ কখনো তোলেনি। কেননা এ কথা মেনে নেয়ায় লালিত অনেক কিছুই কুয়াশা ও ধূলায় বিলীন হয়ে গেল। আমাদের সেই অপাপবিদ্ধতা, ভক্তি আর কাব্যিক জগতের হৃদয়ানুভূতির সেই শংসাপত্রের কাব্যময়তা ও ধর্মীয় বিশ্বাস দিয়ে লালিত প্রত্যয়ের প্রসূন সেই সর্গ্বোদ্যানের কি আর অবশেষ থাকল? যে দৃষ্টিভঙ্গী তার দীক্ষিতদের হাতে তুলে দিয়েছিল এযাবৎ অজ্ঞাত, বস্তুতঃ যার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি, সেই মতবাদের শৃঙ্খলাহীনতার কর্তৃত্ব এবং তাদের কাছে দাবী তুলেছিল মহত্তম সব ভাব ধারণা পোষণের, সেই দৃষ্টিভঙ্গীকে তার সমকালীন মানুষেরা যে সহসা চলতে দিতে চায়নি এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে বাঁধা প্রদান করেছে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।’

লেখক: সভাপতি, বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ, বরিশাল জেলা শাখা
সংস্করণ: জানুয়ারি ২০০৮


এ বিভাগের আরো খবর...

নিকোলাস কোপার্নিকাস: তাঁর জীবন ও কর্ম - রবীন্দ্রনাথ রায়
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)