ইলিশের জীন নকশা উদঘাটন ও ড. মং সানু মারমা

ইলিশের জীন নকশা উদঘাটন প্রধান উদ্যোগী বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. মং সানু মারমা (ছবি সূত্র: ড. মং সানু মারমা)
একজন বিজ্ঞানী শুধুমাত্র তার নিজের বা পরিবারের জন্য কাজ করেন না, বরং মানবতার জন্যই কাজ করেন। আর বিজ্ঞানী বা গবেষককে বিজ্ঞান গবেষণার মধ্যে দিয়ে নিজের দেশের মঙ্গল ও উন্নতির বিষয়ে সচেষ্ট থাকা একান্ত প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশেও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন গবেষণা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। একারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত থেকেও মাতৃভূমির জন্য কিছু করার তাগিদে বিজ্ঞান গবেষক ড. মং সানু মারমা জাতীয় মাছ ইলিশের জেনোম সিকোয়েন্স বা জীন নকশা উদঘাটনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। কসমিক কালচারের সাথে টেলিফোনে একান্ত কথপোকথনে তরুণ প্রজন্মের মাঝেও বিজ্ঞানের এই স্বপ্নগুলো কীভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধাবিত হতে পারে শোনালেন সেই গল্প…

খাগড়াছড়িতে জন্ম নেওয়া মং সানু মারমা যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ২০০৫ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে একটি নতুন প্রজন্মের ডিএনএ বিন্যাস প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি এখানেই জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও নিউক্লিওটাইড রসায়নবিদ হিসাবে কর্মরত। তার আবিষ্কৃত প্রযুক্তি এবং রাসায়নিক ডিএনএ বিন্যাস কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই মাছের জীন নকশা উদঘাটন করা তার জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। কিন্তু মং সানু মারমার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে মূলত নতুন প্রজন্মের ডিএনএ বিন্যাস প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও উৎকর্ষের জন্য কাজ করা হয়। সেই অর্থে এটি মাছের ডিএনএ বিন্যাসের দৈনিক রুটিন কাজের জন্য নয়। তাই তিনি দ্বারস্থ হন তার কাছের বন্ধু ও প্রাক্তন সহকর্মী বুলগেরিয়ান বিজ্ঞানী ড. পিটার ইনাকেভের। এই ধরনের কাজের জন্য পিটারের নিজস্ব একটি ল্যাব রয়েছে। মং সানু মারমা পিটারকে শুধু গবেষণায় প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যগুলো সরবরাহ করেন এবং পিটার আন্তরিকভাবেই তাকে বিনামূল্যে ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ দেন।

আনুমানিক ২০১৭ সালের জানুয়ারির দিকে তিনি গবেষণার সকল প্রস্তুতি নিয়ে ডিএনএ বিন্যাসের জন্য বোস্টনের বাংলাদেশ স্টোর থেকে ইলিশ মাছ কিনে আনেন। কিন্তু নমুনা ইলিশটি ভালোমানের ছিল না। কারণ, মাছটি বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত হওয়ায় এটি জেলেদের দ্বারা ধরা, বিদেশে পাঠানো ও মজুদ প্রক্রিয়ায় যথাযথ শীতল অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়নি। তাই এর ডিএনএ গুনাগুন দিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। মং সানু মারমার প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশ থেকে গবেষণার উপযোগী নমুনা সংগ্রহ করার।

বছরখানেক আগে মং সানু মারমা তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বর্তমানে বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ এর সাথে ইলিশ মাছের জেনোম সিকোয়েন্সিং নিয়ে তার কাজ করার বিষয়ে আলাপ করেন। ড. আজিজ তখন তাকে ব্যাপক উৎসাহ দিয়ে বলেন, তুমি জীবনের অনেকক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছ, এবার দেশের জন্য কিছু করার সময় এসেছে তোমার। শ্রদ্ধাষ্পদ শিক্ষকের এই উৎসাহ বিভিন্নভাবে তার কাজের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিল। এভাবেই ইলিশের জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশের অনেকটা সুযোগ হয়ে উঠল।

কাজের সুবিধার্থে ড. আজিজ মং সানু মারমাকে টেলিফোনে আলাপ করিয়ে দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. হাসিনা খানের সাথে। ড. হাসিনা এই ধরনের গবেষণার কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে একবারেই রাজি হয়ে গেলেন সহযোগিতা করার জন্য। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে পাটের জীন নকশা উদঘাটন সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ড. হাসিনা । মূলত এসময়ে দেশে ইলিশের মৌসুম ছিল না। পরবর্তীতে ইলিশ মাছের মৌসুমে ড. হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ও ইলিশ গবেষক এম নিয়ামুল নাসেরের মাধ্যমে যথাযথভাবে নমুনা সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ ও মং সানু মারমার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

শুরু থেকেই মং সানু মারমা চেয়েছিলেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের দ্বারাই ইলিশ মাছের জীন নকশা উদঘাটিত হোক এবং এই অর্জন বাংলাদেশেরই থাকুক। ডিএনএ অ্যাসম্বেলী করার কাজে ড. হাসিনা খানের মাধ্যমে যুক্ত হন অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশী কম্পিউটেশন্যাল জীববিজ্ঞানী ড. আব্দুল বাতেন। ড. বাতেন সুপার কম্পিউটারে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিএনএ অ্যাসম্বেলীর কাজটি করেন। ইলিশের জীন নকশা উদঘাটনের এই পুরো প্রক্রিয়াটিই করা হয়েছিল ব্যক্তি উদ্যোগে। মং সানু মারমা জানান, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে কখনোই সম্পূর্ণ জীন তথ্য পাওয়া যায় না, এজন্য জেনোমিক ডিএনএ বা নিউক্লিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। যতদূর জানা যায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর একটি স্বতন্ত্র গবেষক দল শুধুমাত্র মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছেন। যা ইলিশ মাছের সম্পূর্ণ ডিএনএ তথ্যের শুধুমাত্র ০.০০১৭% প্রদর্শন করে। তাই জেনোমিক ডিএনএ বা নিউক্লিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণে প্রাপ্ত তথ্যের কাছে অন্য যেকোন পরিমাণের তথ্যই উপেক্ষা করার মতো।

চলতি বছরের মার্চ মাস নাগাদ মং সানু মারমা তাদের কাজ শেষ করে আনেন। তারা ডিএনএন বিশ্লেষণের পাশাপাশি আরএনএ বিশ্লেষণও করেন। কারণ ডিএনএতে সংরক্ষিত বংশগতির তথ্য নিয়ে তৈরি হয় আরএনএ। আবার আরএনএ থেকে তথ্য নিয়ে জীবদেহের বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন তৈরি হয়। এভাবে আরএনএ বিন্যাস থেকে জীন নিশ্চিত করা সম্ভব। মং সানু মারমা এক আনুমানিক হিসেবে জানান, তাদের গবেষক দল ইলিশ মাছের জীন নকশায় ১০০ কোটি বেইস্ পেয়ার (রাসায়নিক একক) ও ৩০ হাজার জীন নিশ্চিত করেছেন।

গবেষকদের এই আবিষ্কারের বিশ্বস্বীকৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মং সানু মারমা বলেন, সাধারণত বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কারের জন্য যার গবেষণা প্রবন্ধটি আগে প্রকাশিত হবে তাকেই এর উদ্ভাবক বা আবিষ্কারক হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু জীন নকশা উদঘাটন অত্যন্ত বড় পরিসরের বিষয়, এটি দেশের জাতীয় সম্পদ যার সাথে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন জড়িত থাকে। তাই এটি কোথাও প্রকাশিত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এর আবিষ্কার সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়া হয়ে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় ড. হাসিনা খানের নেতৃত্বে তাদের গবেষক দল বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিব্যক্তি রোমন্থনে মং সানু মারমা উল্লেখ করেন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, কিন্তু তার অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি গ্রামের পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন, তাই গ্রামের মানুষের কষ্টকর জীবন-যাপন সম্পর্কে তিনি অবহিত। জেলেদের কষ্টকর জীবনের সাথে তিনি পরিচিত। একারণে তিনি মনে করেন ইলিশ মাছের জীন নকশা উদঘাটনের মাধ্যমে তিনি কাজের ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন। বলা চলে তিনটি মহাদেশ মিলে এই কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এখান থেকেই পরবর্তীতে শুরু করা যাবে। ইতোমধ্যে অনেকেই ইন্টারনেটে তাকে খুঁজে বের করে তার সাথে যোগাযোগ ও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তার মতে এইসব আগ্রহ থাকলে বাংলাদেশ ঠিকই একদিন এগিয়ে যাবে।

প্রান্তিক এলাকায় বেড়ে ওঠা আদিবাসী মং সানু মারমার এই সাফল্য তার নিজস্ব নৃগোষ্ঠীর মধ্যে আশার সঞ্চার করবে, স্বপ্ন দেখাবে তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার - এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি। বাংলাদেশে এখনো বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ে গবেষণার যথেষ্ট সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা দেশের বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় নিঃসন্দেহে ভূমিকা রাখছে। তার আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ডিএনএ বিন্যাস কাজে দেশে ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে ঠিকই ব্যবহৃত হবে বলে তিনি মনে করেন। তরুণ প্রজন্মের মাঝে এভাবেই হয়তো একদিন স্বপ্নেরা জাল বুনবে, প্রথাগত সরকারী চাকুরীর বাইরেও বিজ্ঞান গবেষণা-আবিষ্কারের নেশায় সঞ্চালিত হবে তরুণ প্রাণ-মন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যোয়েল কর্মকার
৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮


এ বিভাগের আরো খবর...
প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে পল এরিখ প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে পল এরিখ
প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে ড. জেরার্ডো সেবালোস প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে ড. জেরার্ডো সেবালোস
মার্স ওয়ান মিশন সম্পর্কে বিজ্ঞানকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত মার্স ওয়ান মিশন সম্পর্কে বিজ্ঞানকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্টিফেন হকিং এর সাক্ষাৎকার স্টিফেন হকিং এর সাক্ষাৎকার
কার্ল সাগানের সাক্ষাৎকার কার্ল সাগানের সাক্ষাৎকার

ইলিশের জীন নকশা উদঘাটন ও ড. মং সানু মারমা
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)