প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে ড. জেরার্ডো সেবালোস

কয়েক লক্ষ বছর ধরে সগর্বে পৃথিবী রাজত্ব করা মনুষ্য প্রজাতি ভবিষ্যতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এমনটা শুনলে সকলেরই চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার কথা! কিন্তু আদতে এমন সতর্কবাণীই শুনিয়েছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। এর আগে পৃথিবীতে প্রাণীকূলের গণবিলুপ্তি ঘটেছিল আজ থেকে ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে অতিকায় ডাইনোসরের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হওয়ার মধ্যে দিয়ে। ধারণা করা হয়, তখন অতিকায় গ্রহাণুপুঞ্জ পৃথিবীতে আঘাত হানার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ এর। অর্থাৎ গ্রহাণু পৃথিবীপৃষ্ঠে সজোরে আছড়ে পড়ার কারণে পৃথিবীপৃষ্ঠের চারপাশে ঘন মেঘের স্তর সৃষ্টি হয়েছিল, যা পৃথিবী পৃষ্ঠে সূর্যের আলো পৌঁছতে বাধা দেয়। ফলশ্রুতিতে কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে খাদ্যাভাবে বিলুপ্তি ঘটে ডাইনোসরের।

গত ১৯ জুন, ২০১৫ তারিখে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা স্বাভাবিকের চেয়ে ১১৪ গুণ দ্রুত হারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই বিলীয়মান সারির প্রথমেই মনুষ্য প্রজাতি থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক বাণী করেছেন পৃথিবীর প্রাণীকূল ষষ্ঠবারের মতো গণবিলুপ্তির শিকার হতে যাচ্ছে, আর এটি ঘটবে স্বাভাবিকের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি হারে। এই বিষয়ে আমরা যোগাযোগ করি গবেষণা কাজের সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞানীদের সাথে। ই-মেইলের মাধ্যমে কালচারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে তাদের একান্ত ভাবনা প্রকাশ পায়।

ড. জেরার্ডো সেবালোস

ভিজিটিং প্রফেসর, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষণা প্রবন্ধের প্রধান লেখক

ড. জেরার্ডো সেবালোস, ভিজিটিং প্রফেসর, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রবন্ধের প্রধান লেখকআপনি কখন এবং কিভাবে ধারণা করলেন যে মনুষ্য সৃষ্ট প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে? এটি কি পর্যবেক্ষণগত কোন ফলাফল ছিল নাকি অন্য কোন বিষয়ে গবেষণা করার সময়ে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে? এই গবেষণার ভিত্তি কি?
: আমরা সুনির্দিষ্টভাবে প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি মূল্যায়ণ করার পরিকল্পনা করেছিলাম। আর ২০১০ সালে পল এরিখের সাথে যৌথভাবে এরকমই একটি গবেষণা প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু এখন আমরা খুবই পরিমিত তথ্য ব্যবহার করে ফলাফলটি মূল্যায়ণ করতে চেয়েছিলাম। আমি ফলাফল দেখে খুবই আশ্চর্য হয়ে যাই, কারণ আমি গণ বিলুপ্তির এমন ফলাফল প্রত্যাশা করিনি।

আপনারা এই ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তিকে সম্পূর্ণভাবে মানুষের দ্বারা সৃষ্টি বলে দাবি করছেন। এর পেছনে কি অন্য কোন কারণ রয়েছে?
প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তির জন্য মূলত মানুষই দায়ী। এটিই ছিল গবেষণার মূল বিষয়। প্রাকৃতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে আমরা বড়জোর ৮টি প্রজাতির বিলুপ্তি ধরতে পারি, কিন্তু গত একশ বছরে ইতিমধ্যে ৪৭৭ টি প্রজাতি বিলুপ্তির সম্মুখীন হয়েছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক অন্যায্যতা, প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে সমগ্র বিচরণক্ষেত্র নষ্ট করা, মাত্রাতিরিক্ত স্বার্থসিদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে প্রজাতি বিলুপ্তির মতো ঘটনা ঘটবে। চায়নার উচিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক চুক্তির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা, এটিই বিপন্নপ্রায় প্রজাতির অবৈধ বাণিজ্যের সবথেকে বড় বাজার।

আমরা জানি ৫ম গণ বিলুপ্তির মধ্যে দিয়ে ডাইনোসর পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তার পরবর্তীতে প্রাকৃতিক বাছাইয়ের মাধ্যমে মানুষই সর্বোচ্চ প্রজাতি হিসেবে বর্তমানে টিকে রয়েছে। তাহলে প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তির পরে ঠিক কি ঘটবে বলে আপনি মনে করেন?
আমরা গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছি যে, কয়েক মিলিয়ন বছর পরে পৃথিবীতে পুনরায় জীবনের বিকাশ ঘটবে। কিন্তু প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তির পরে ঠিক কি ঘটবে তা আমাদের গবেষণার সাথে অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তখন পৃথিবীতে আমাদের কোন অস্তিত্বই থাকবে না।

সভ্যতা বিনির্মাণে পরবর্তী পৃথিবীতে কোন প্রজাতি টিকে থাকবে?
এটি বলা কঠিন! তবে সেই সকল প্রজাতিই টিকে থাকবে যারা মানুষের দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। আমরা যদি এখনই কার্যকরী উদ্যোগ না নেই তবে খুব শীঘ্রই অধিকাংশ বৃহদাকার প্রাণীদের হারাবো।

প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি কি অবশ্যম্ভাবী?
এটি সম্ভবত কয়েকশত বছর পরে ঘটবে।

এই গণ বিলুপ্তি রোধ বা ঠেকানোর কোন কার্যকরী উপায় কি রয়েছে?
বর্তমান বিলুপ্তির হার সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত থাকা এবং আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন সব পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। এগুলো জাতীয় নিরাপত্তাজনিত সমস্যা। তাই আমাদের এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপচয় করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। পারিবারিক পর্যায়ে আমাদের কার্বণ ব্যবহার হ্রাস করতে হবে, মাংস সংরক্ষণের প্রবণতা কমাত হবে, পানির পরিমিত ব্যবহার করতে হবে এবং কখনোই বিপন্ন প্রজাতির দ্বারা তৈরি কোন পণ্য ব্যবহার বা ক্রয় করা যাবে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য জনগণের জন্য প্রনীত নীতিমালাসমূহ অনুসরণ করতে হবে।
এখানে আমাদের কোন পছন্দ নেই। আমরা যদি সত্যিসত্যিই দ্রুত কোন উদ্যোগ না নেই তাহলে বিপর্যয় এড়াতে পারব না। কিন্তু আমি আশাবাদী। আমরা মানুষরা এই বিপর্যয় চাইলে এড়াতে সক্ষম হব।

২০০৪ সালের দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি সম্পর্কে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেটি কি বর্তমান গবেষণা থেকে ভিন্নতর ছিল অথবা দুইয়ের মধ্যে কোন সাদৃশ্য রয়েছে কি?
উভয় ক্ষেত্রেই খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ ফলাফল পাওয়া গেছে। শুধু পার্থক্য এটাই যে আমরা খুব পরিমিত তথ্য ব্যবহার করেছি, কিন্তু উপসংহারে আমরা দুই ক্ষেত্রেই একই জায়গায় পৌঁছেছি। ফলে এটি সত্যিই নির্দেশ করছে যে আমরা প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তিতে প্রবেশ করছি।

মনুষ্য সৃষ্ট ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তির কারণ হিসেবে কোন বিষয়টিকে আপনি উল্লেখযোগ্য মনে করছেন? এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কি ভূমিকা থাকতে পারে?
৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি ঘটার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। যদি ৬ষ্ঠ গণ বিলুপ্তি চলমান থাকে তবে সেটি বাংলাদেশের জন্য দুঃখজনকই বটে, কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অধিকতর ঝুকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
ড. জেরার্ডো সেবালোস, ভিজিটিং প্রফেসর, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রবন্ধের প্রধান লেখক

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: যোয়েল কর্মকার
১৮ জুলাই, ২০১৫


এ বিভাগের আরো খবর...
প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে পল এরিখ প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে পল এরিখ
মার্স ওয়ান মিশন সম্পর্কে বিজ্ঞানকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত মার্স ওয়ান মিশন সম্পর্কে বিজ্ঞানকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
স্টিফেন হকিং এর সাক্ষাৎকার স্টিফেন হকিং এর সাক্ষাৎকার
কার্ল সাগানের সাক্ষাৎকার কার্ল সাগানের সাক্ষাৎকার

প্রজাতির ৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তি প্রসঙ্গে ড. জেরার্ডো সেবালোস
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet