ধর্মীয় অনুশাসন আশ্রিত অপব্যাখ্যার দায়ভার! - যোয়েল কর্মকার

৩১ অক্টোবর, ১৯৯২। এই দিনটিতে একজন বিজ্ঞানীকে তিনশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়ানো ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া হয়। স্বভাবতঃই ঘটনাটি আমাদের মনে বিস্ময় জাগিয়ে তোলে। একজন বিজ্ঞানীকে কেন এভাবে বয়ে বেড়াতে হবে চাপিয়ে দেয়া গ্লানির ভার। মূল ঘটনাটি জানতে হলে আমাদের পেছনের দিকে তাকাতে হবে।
পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণায়মান - এই সত্যটি এখন সর্বজন স্বীকৃত ও প্রমানিত হলেও খ্রি. পূ. চতুর্থ শতকে গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল কর্তৃক প্রচারিত ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদটি(১) তৎকালীন সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার কারণে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে মিশরীয় গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ ক্লডিয়াস টলেমি এরিস্টটলের এই ধারণাকে সমপ্রসারিত করে ব্রহ্মান্ডের একটি সম্পূর্ণ প্রতিরূপ(২) তৈরি করেছিলেন। যার কেন্দ্রে ছিল পৃথিবী। তাঁরা তাঁদের সময়ে এতোটাই মহাজ্ঞানী ছিলেন যে, কেউ তাঁদের মতবাদে অবিশ্বাস করেনি। এভাবে ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদের মত একটি ভ্রান্ত ধারণা মানুষকে আঠারোশ’ বছর পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

এই ঘটনার অনেক পরে পোলিশ জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর যুগান্তকারী ‘De Revolutionibus Orbium Coelestium’ বইয়ে সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদের(৩) ব্যাখ্যা করে সমাধি ঘটান এরিস্টটলীয়-টলেমিয় তত্ত্বের অসাড়তার। বইটি ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পর খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা এটিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী মনে করে সাধারণের নাগালের বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। কোপার্নিকাস তাঁর জীবদ্দশায় সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদটি প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও এর ৭৩ বছর পর জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলি (১৫৫৮-১৬৪২) ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে বইটিকে সকলের নজরে আনেন এবং এই মতবাদকে সমর্থন করে নিজেও একটি বই রচনা করেন। যা সাধারণের কাছে অধিক যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় নেতারা বরাবরের মতই বইটিকে সাথে সাথে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। একই সাথে গ্যালিলিও গ্যালিলিকে ধর্ম ও বাইবেল বিরোধী বক্তব্য প্রচারের নামে ধর্মদ্রোহিতায় অভিযুক্ত করা হয়। মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও জ্ঞানালোকের বিস্তারে আবারো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সত্তরোর্ধ এই বিজ্ঞান প্রতিভাকে বাধ্য করা হয়েছিল সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদ সম্পর্কিত সকর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে অস্বীকার করতে। ধর্মীয় ইনক্যুইজিশনের নামে তাকে সকলের সামনে শপথ করানো হয় ভবিষ্যতে এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য। সেই শপথবাক্যটি বাংলাতে অনেকটা এরকম:
“আমি ফ্লোরেন্সবাসী স্বর্গীয় ভিন্সেজিও গ্যালিলিও এর পুত্র সত্তর বছর বয়স্ক গ্যালিলিও গ্যালিলি, সশরীরে বিচারের জন্য এসেছি এবং বিখ্যাত ও সম্মানিত ধর্মযাজক এবং ধর্মবিরুদ্ধ আচরণের অপরাধে অপরাধী হয়ে বিচারকদের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করে শপথ করছি যে: রোমের পবিত্র ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্ম সংস্থার দ্বারা যা কিছু শিক্ষাদান এবং প্রচার করা হয়েছে আমি তা বিশ্বাস করি, আগেও করেছি, ভবিষ্যতেও করব। আমাকে বলা হয়েছিল সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্রস্থল - এই মতবাদটি মিথ্যা এবং ধর্মগ্রন্থ বিরোধী, আমাকে এই মতবাদ সমর্থন এবং প্রচার থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছিল। তারপরেও আমি এই মতবাদকে সমর্থন করে একটি বই লিখেছিলাম এবং সংগত কারণেই সাধারণের মনে সন্দেহ হতে পারে, আমি খ্রিষ্টধর্ম বিরোধী। সকলের মন থেকে সন্দেহ দূর করার জন্যে আমি শপথ করে বলছি যে, এই ভুল, মিথ্যা এবং ধর্ম বিরুদ্ধ মত ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করছি। আমি আরও শপথ করে বলছি যে, এ ধরনের বিষয় সম্বন্ধে ভবিষ্যতে কিছু বলব না। শপথ নিয়ে আরও প্রতিজ্ঞা করছি, আমাকে প্রায়শ্চিত্যের জন্যে যে নির্দেশ দেওয়া হবে আমি সেটা হুবুহু পালন করব। আমি যদি এই শপথ আর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করি, তাহলে আমার জন্য যেসব নির্যাতন ও শাস্তির ব্যবস্থা আছে আমি তা মাথা পেতে গ্রহণ করব।”
কিন্তু যুক্তি আর প্রমানের নিরিখে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যকে কখনোই অবরুদ্ধ করে রাখা সম্ভব হয়নি। আর এ কারণেই গ্যালিলিওর মৃত্যুর তিনশ বছরের অধিককাল পরে ভ্যাটিকান সিটির পোপ দ্বিতীয় জন পল (খ্রিষ্টান ক্যাথলিক সমপ্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু) বাধ্য হন এই ব্যাপারটা তাদের জন্য যে ভুল ছিল তা স্বীকার করতে, তাঁর উপর থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে এবং এই ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে। তবুও প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার এই সময়ে এখনও যখন চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণে মানুষের নিরম্বু উপবাস চলে, যখন সূর্য পূর্বে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যায় এ জাতীয় অবৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থাপন করা হয় তখন মনে হয় ধর্মীয় অনুশাসনের অপব্যাখ্যা আশ্রিত সেই ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদে আজও আমরা সমর্থন জানাচ্ছি। যেন পৃথিবী এখনও স্থির!

টীকা ১. এরিস্টটলের ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্ব মতবাদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে - পৃথিবীটা স্থির এবং সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ ও নক্ষত্ররা পৃথিবীর চারিদিকে বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণায়মান। তিনি অতীন্দ্রিয়বাদী যুক্তিতে বিশ্বাস করেন আর এ থেকেই তিনি
ধারণা করেন পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান গ্রহ-নক্ষত্রের বৃত্তাকার গতিপথ সবচাইতে নিখুঁত।
২. এই প্রতিরূপের কেন্দ্রে ছিল পৃথিবী এবং তাকে ঘিরে ছিল আটটি গোলক। এই গোলকগুলো নির্দেশ করত চন্দ্র, সূর্য, স্থির নক্ষত্র এবং সেই সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত পাঁচটি গ্রহ - বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিকে।
৩. আমরা বর্তমানে যে মতবাদের সাথে পরিচিত, অর্থাৎ আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রস্থল হচ্ছে সূর্য।

লেখক: বিজ্ঞান কর্মী ও সংগঠক।


এ বিভাগের আরো খবর...
গ্যালিলিওকে ভ্যাটিকানের শ্রদ্ধা প্রসঙ্গে অভিমত: বিজ্ঞানচেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ গ্যালিলিওকে ভ্যাটিকানের শ্রদ্ধা প্রসঙ্গে অভিমত: বিজ্ঞানচেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ
গ্যালিলিও গ্যালিলি’র প্রতি ভ্যাটিকানের শ্রদ্ধা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র প্রতি ভ্যাটিকানের শ্রদ্ধা
জ্যোতিষ বনাম বিজ্ঞান জ্যোতিষ বনাম বিজ্ঞান

ধর্মীয় অনুশাসন আশ্রিত অপব্যাখ্যার দায়ভার! - যোয়েল কর্মকার
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)